বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৪

বিজয়ের স্মৃতিকথা >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল






বিজয়ের স্মৃতিকথা >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
০১.
১৯৭০ সাল । নভেম্বর। উপকুল জুড়ে বয়ে গেল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় । ৩০ হাজার মানুষ মরে গেলো । আমার বাড়ী ভোলা, সাগর মেখলা উপকুলীয় দ্বীপ । কিন্তু আমি ছিলাম বাণড়ীপাড়া । বানরীপাড়া ইউনিয়ন ইনষ্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র । দুলাভাই পোষ্ট মাষ্টার । তার সাথে । বন্যার তৃতীয় দিনে দুলাভাইর সাথে ভোলা রওনা দিলাম । লঞ্চে ।১২ /১৩ বৎসরের বালক আমি l হাফপেন্ট পড়ি । বরিশাল ছেড়ে ভোলার দিকে যত এগুচ্ছি, বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট । নদীর পাড়ের লোকালয়গুলোতে কোন আস্ত ঘর-বাড়ী বা সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকা কোন গাছ নাই । কালাবদর নদী পেরিয়ে ইলিশা ! কিন্তু এখানে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু ! মানুষের ফুলে ওঠা, ভেসে আসা লাশ । লাশের পরে লাশ । লাশের মিছিলের পাশ কাটিয়ে ফাক ফোকর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে লঞ্চ । অবশেষে ভোলা লঞ্চঘাট । ভোলা থেকে ১২ মাইল দুরে আমাদের বাড়ী, দৌলতখান । বাসে যেতে হয় । আমরা বলি মোটর। এক ঘন্টার পথ । কিন্তু মোটর কোথায় ! রাস্তাইতো নাই ! দুলাভাই দু'টো লম্বা লাঠি যোগাড় করে একটা আমাকে দিলেন । পানির মধ্যে লাঠি দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে পথ খুঁজে নিয়ে চলা । পথে ডোবায় ভেসে থাকা লাশ, ঝড়ে মাথা মুচড়ে যাওয়া গাছের ডগায় আটকে থাকা লাশ, দেখতে দেখতে সন্ধ্যার আধারে পথ চলা । অবশেষে বাড়ী ফেরা ।
কিন্তু বাড়ী কোথায় ! উঠোনের দুই মাথায় দুটো ঘরের একটার চিহ্নই নেই, অপরটার ভিটির উপরে থ্যাবড়ে পড়া চাল, তার নীচে অবশেষে খুঁজে পেতে পাওয়া কিছু তৈজস পত্র নিয়ে বসে আছে আমার মা আর বোন, আর জনার মা, চিরদিনের গরীব মহিলাদের সেই প্রতিনিধি, যারা কিছু নিতে নয়, এমনিতেই ভালবাসতে জানে, বিপদে পাশে থাকতে জানে ।
পরদিন সকালে আনারুল এলো । আমার সারাজীবনের একমাত্র বন্ধু, যার কাছে আমার কোন দোষ-অসমপূর্ণতা ছিলনা, আমি ছিলাম তার একান্তই মনের মতো, পারফেক্ট । আমি ভুল বললেও সেটা সে বিশ্বাসই শুধু করতোনা, সবার কাছে সত্য বলে প্রমাণও করতো । হ্যা, সেই ক্ষমতা তার ছিলো, সে ছিলো প্রকৃতিগতভাবেই ''নেতা'' ।
আনারুলের কাছেই শুনলাম, এমন মহা-প্রলয়ের পরেও আমাদের দুরবস্থা দেখার জন্য সরকারী তরফের কেউ আসেনি । মাঝে মাঝে হেলিকপ্টার উড়ে এসে কিছু রিলিফের বস্তা ফেলে যাচ্ছে, তাতে থাকছে কাঠের চাকার মতো বিস্কুট, চিনি দিয়ে বানানো গুটূলী, আর কোন কোন বস্তায় 'ছাতু' । ছাতু তো আমরা চিনতাম না, মনে করতাম মিষ্টি স্বাদের আটা ।

আনারুল ছাত্রলীগ করতো । আরেক বন্ধু মোহাম্মদ আলী করতো ইসলামী ছাত্র সংঘ । ওদের কাছে জানলাম বন্যার সময় আমাদের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান চীন সফরে ছিলেন । তাকে যখন পাকিসথানে সাইক্লোনের সংবাদটা পৌছানো হয়, তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, 'ইষ্ট অর ওয়েষ্ট ?' 'ইষ্ট' শুনে সংবাদটা তাকে আরো দুদিন পরে দেবার জন্য বলেছিলেন । কারন চীনের সাথে বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূ্র্ণ কাজ তখনো বাকী ।
০২.
১৯৭১ সাল, ৮ই মার্চ । দুপুর ০১-৩০ মিনিট । ভোলা থেকে বরিশাল যাচ্ছি লঞ্চে । লঞ্চ কালা বদর নদীর মাঝে । লঞ্চের ছাদে দুই সাদা চামড়ার বিদেশী ছোট একটা রেডিও নিয়ে বিভিন্ন ষ্টেশন ঘুরছে, আকাশবানীই বেশী । হঠাৎ করে বেজে উঠলো, 'ঢাকা বেতার কেন্দ্র, একদিনের বিরতির পর আমাদের অধিবেশন আবার শুরু হলো । এই অধিবেশন একযোগে সম্প্রচারিত হচ্ছে ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা কেন্দ্র থেকে । এখন প্রচারিত হবে গতকাল রেস কোর্স ময়দানে বাঙ্গালী জাতির অবিসম্বাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণ । ' সমস্ত উৎসুক মানুষের কান খাড়া, মন একাগ্র, বিদেশী দুজনেরও ।
০৩.
২৭ মার্চ । সন্ধেবেলা । বরিশাল পাতারহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে লেঙ্গুটিয়া বাজার । দুলাভাই সেখানে পোষ্টমাষ্টার । আমরা তিন ভাইবোনও সেখানে । দাদা (আমার বড় ভাই শামসুদ্দিন খোকন) ছুটে এসে খবর দিলেন,'একজন চায়নিজ স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার কিছু একটা ঘোষনা দিচ্ছেন, পুরোটা বোঝা যাচ্ছে না ।' দুলাভাই আর আমি ছুটলাম তা শুনতে, গণেশদের ঔষধের ফার্মেসীতে । ''আই মেজ চিয়া, হিয়ার বাই ডিক্লেয়ার, ইন্ডপেন্ডনট অব বাংলাদেশ, বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট লিডার.......' কান্নায় চোখ ভিজে গেল আমার, বুকটা ভারী হয়ে গেছে । বজারের সব লোক ভিড় করে শুনছে বিদেশী লোকটার বক্তব্য, ভাষা দুর্বোধ্য হলেও তার আবেগ স্পর্শ করছে সবার রিদয় । আমি তখন লেঙ্গুটিয়া হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ি।
০৪.
১৬ ডিসেম্বর সকাল নয়টা থেকেই পাক আর্মী সারন্ডারের প্রস্তুতি নিচ্ছল । স্বাধীন বাংলা বেতার এবং আকাশ বাণী কোলকাতা খুলে বসে আছে সারা দেশের গ্রামের মানুষ । আমরা বরিশালে, আমানতগঞ্জে, খালার বাসায় । মাহমুদিয়া মাদ্রাসার একজন তালেবে এলেম আম্মার সাথে দেখা করতে এলো । আল-বদরে ছিলো । ধার্মীক ছেলে, তার মতে এই যুদ্ধ অনিসলামিক । তাই নভেম্বরেই পালিয়েছিল বাহিনী থেকে । পাক আর্মী সারেন্ডার করবে জেনে একটু স্বস্থি পেয়েছে, আর পালিয়ে থাকতে হবে না । মুরব্বীদের দোয়া নিয়ে বিদায় নিলেন । কোথায় যাবে, সেও বলেনি, আমরাও জানতে চাইনি। জানাটা ঠিক হতোনা । তার ভরসা পাওয়াটা কদ্দুর সঠিক ছিল আজও জানতে পারিনি ।
পাঁচটা এক মিনিটে আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষরের পরে এই নর-পশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহন করলো ভারতীয় আর্মী । অবশ্য তার অনেক আগেই পাকিস্তানে থাকা বাঙ্গালীদেরকে কনসেনটেশন ক্যাম্পে জিম্মি করে ফেলেছে পাকিস্তান । আমাদের প্রতিশোধ নেয়ার পথ খোলা রইলনা ।
অবশ্য বর্তমানের মতো অবস্হা যদি থাকতো, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব যদি থাকতো অন্য কোন দল, তাহলে পরিস্থিতি অবশ্যই অন্যরকম হতো । মন ভরে পাক আর্মী আর বিহারী, দালাল হত্যা করে মনের ঝাল মিটাতে পারতাম আমরা । পাকিস্তানে আটক তিন হাজার বাঙ্গালীকে ওরা কোরবানী দিতো, তাতে আমাদের কি, ওদের অনেকে তো দেশে ফিরেও পাক-দালালীই করেছে !
কিন্তু ঐ সময়ের আমরা একফোটা বাঙ্গালী রক্তও ঝড়াতে চাইনি । দালাল আইনে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদ বোধ করেছেন ফ. কা. চৌধুরী । সবুর খানকে গোপনে অর্থ সাহায্য করেছেন বঙ্গবন্ধু । সেই বাঙ্গালী কি আছে ? এখন আছে বাংলাদেশীরা !










বেড়ে ওঠার সময় >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল







বেড়ে ওঠার সময় >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
তখন পাকিস্থানী আমল । ১৪ ফেব্রুয়ারী যে ভ্যালেনটাইন ডে, এটা তখন কেউ জানতোই না । নিজের জন্মের তারিখ বলেই দিনটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো । তখন খুব ছোট-বেলা । পোষ্ট মাষ্টার দুলাভাইর কল্যাণে পড়তে শেখার সময় থেকেই দৈনিক পত্রিকা পড়াটাও শিখে গেছি । তখন এখনকার মতো 'চাহিবামাত্র' হাতের কাছে বিভিন্ন ধরনের দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পাওয়া যেতো না । মফস্বল, থানা সদরে বাড়ী । যারা পেপার পড়তেন, তাদের জন্য পোষ্টাফিসই ছিল একমাত্র ভরসা । বাৎসরিক গ্রাহক হতে হতো এককালীন অগ্রীম টাকা পাঠিয়ে । ৫ তারিখের পেপার, লেখা থাকতো '৫ মে'৬৯ শনিবার, মফস্বল ৬ মে'৬৯ রবিবার' । তাও ডাকে আসতে আসতে হয়ে যেতো ১০ মে'৬৯ । তবু তাতেই যে কি মজা ছিল । অবশ্য তখনকার ডাক বিভাগ এখনকার মতো বেপরোয়াভাবে চিঠিপত্র হারাতো না । আমাদের পাষ্টাফিসের মাধ্যমে আসতো 'দৈনিক আজাদ' , 'দৈনিক ইত্তেফাক' আর 'মর্নিং নিউজ' । বলা বাহুল্য এক কপি করেই । আজাদের 'মুকুলের মাহফিল' আর ইত্তেফাকের 'কচি-কাঁচার আসর' পড়তাম না, গিলতাম হুমড়ি খেয়ে । আমার এই পড়ুয়া স্বভাবের জন্য খুশী হয়ে অথবা অন্য লোকের পেপার খুলে পড়তাম, এই বিরক্তিতে দুলাভাই আমাকে 'মাসিক কচি-কাঁচা'র গ্রাহক করে দিলেন । মাসিক 'খেলাঘর'ও পেতাম মাঝে মাঝে । পড়তাম, আর অবাক হয়ে ভাবতাম, এই লেখাগুলো আমার মতো মানুষেরই লেখা ! 'শিশু সাথী'র একটা ভলিউম পেয়ে গেলাম এক সময় । নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিনরাত পড়ে শেষ করলাম । হণ্যে হয়ে বই পড়তাম এবং খুঁজতাম । শশঁধর দত্তের 'দস্যু মোহণ' , আবুল কাশেমের 'দস্যু বাহরাম', 'ভুলু ডাকাত', অনেকগুলো খন্ড পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেল । ঐ সময় খোঁজ পেলাম বিদ্যুৎ মিত্রের 'কুয়াশা' সিরিজের । নেশা ধরে গেল পড়ার । মাসুদ রানা সিরিজের 'স্বর্ণমৃগ' বইটা দোলন ভাইর কাছ থেকে যোগার করে পড়ি । বইটা তখন পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করেছিল ।
বই পড়ার নেশা এমনভাবে পেয়ে বসলো যে, একটা ভালো বই পড়তে দিয়ে আমাকে দিয়ে যে কোনো কাজ করিয়ে নেয়া যেতো ।
তখন থেকেই বোধহয় লেখা-লেখির ইচ্ছাটা জেগে উঠতে থাকে আমার মনের মধ্যে । পড়তাম গদ্যের বই, কিন্তু লিখতে শুরু করলাম পদ্য । কেন যে, তা আজও বুঝি না ।
'নবীন করিব রচনা' নামের একটা রচনা লিখে ফেললাম এবং অনেক সাধনায় অর্জিত জ্ঞান বুদ্ধির দৌলতে সর্বত্র পাঠাতে লাগলাম । কিন্তু সাধু ভাষায় লেখা আমার এই চমৎকার (!) কবিতাটি কেউই ছাঁপায় না ! দৈনিক সংবাদে 'খেলাঘর' পাতা বেরুতো তখন । বড় ভাইর এক বন্ধুর নামে ডাকে 'সংবাদ' আসতে শুরু করলো । খেলাঘরের খোঁজ পেয়ে ওখানেই পাঠালাম 'নবীন করিব রচনা'র দৃঢ় প্রত্যয়টি । পরের সপ্তাহেই এলো । না কবিতা ছাপা হয়নি, চিঠির জবাবের কলামে ছাপার অক্ষরে আমার নাম ছাপা হয়েছে ঠিকানাসহ । পরিচালক জানিয়েছেন, সাধু ভাষায় লেখালেখি করতে হলে রবীন্দ্রনাথের যুগে ফিরে গিয়ে জন্ম নিতে হবে , আর অভিধান দেখে দেখে কেউ কবিতা পড়ে না । সুতরাং বর্তমান উপযোগী ভাষা এবং বাক্য দিয়ে আমাকে 'নবীন' রচনা করতে হবে, যদি লেখক হতে চাই । সুতরাং এতো সুন্দর আর পছন্দের কবিতাটি আমার মাঠে মারা গেলো !
গল্প উপন্যাস খুব পড়তাম, আগেই বলেছি । সুতরাং এবার গদ্য নিয়ে পড়লাম । একমাত্র পাঠক দুলাভাই । উনি মোটামোটি প্রশংসাই করেন, কিন্তু ছাপা না হলে লিখে কি আনন্দ হয় ! প্রথম লেখার করুন অভিজ্ঞতা ভুলতে পারিনি বলে আর পত্রিকায় লেখা পাঠাবার দুঃসাহস করিনি । অবশ্য গোগ্রাসে গল্প উপন্যাস গেলাটা বন্ধ হয়নি , বরং আরো বেড়েছে । ক্লাসিক থেকে বটতলা পর্যন্ত কিছুতে অরুচি নেই ।
তখন হাইস্কুলে পড়ি । মূক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে । তিয়াত্তরের শেষদিক । আজাদের মুকুলের মাহফিলে 'এক বিকেলের গল্প' নামে একটা গল্প পাঠালাম । গোপন রাখতে হলো বিষয়টা । যদিও পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করি না, তবু বন্ধুদের মধ্যে সাহিত্য বোদ্ধা হিসাবে আমার খুব নাম ডাক । প্রথমবার কবিতা পাঠাবার সময় একেবারে পিচ্চি ছিলাম , তাই দুলাভাই ছাড়া আর কারো জানা নাই ঐ ঘটনার কথা, কিন্তু এখন তো আমি ছোট্টটি নেই, হাইস্কুলে পড়ি, হাতে ঘড়ি, মাঝে মাঝে ফুলপেন্টও পড়ি, কাজেই ইজ্জতের ব্যাপারটাও তো আছে !
চাতক পাখীর মতো হা করে বসে থাকি পোষ্টাফিসের বারান্দায় । কখন রানার আসবে ! কিন্তু না, পরের সংখ্যায় খবর নেই । আতিপাঁতি করে খুঁজেও না পেয়ে দমে গেলাম । এবারো বোধহয় আগের মতোই ফলাফল ! মনটা বড্ড বিমর্ষ হয়ে থাকলো গোটা সপ্তাহ জুড়ে ।
পরের সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে তুমুল ঝড় বৃষ্টি, ডাক এলো না । সারা বিকেল - সন্ধ্যেটাই মাটি হয়ে গেল আমার । সারা রাত ঘুম এলো না, বিছানায় এপাশ ওপাশ করে ভোর হলো । সময় আর কাটে না । ঝড় বৃষ্টি থেমে গেছে রাতেই । রানারের অপেক্ষায় সকাল থেকে বসে আছি পোষ্টাফিসের বারান্দায় । বসে আছি তো আছি । অবশেষে এলো রানার লতিফ বল্লমের গলায় লাগানো ঘন্টা বাজাতে বাজাতে । এর আগে যে কতোবার সাইকেল রিকশার বেল বাজাবার টুংটাং শুনে চমকে উঠেছি !
ডাক খোলা হলো । সর্টিং শেষ হলো । দুরু দুরু বুকে দারুন উত্তেজনা নিয়ে দাড়িয়ে আছি দুলাভাইর পিঠ ঘেষে । অবশেষে পোষ্টম্যান বশির নানা পত্রিকাগুলো দুলাভাইর সামনে রাখলেন । ফোস করে নিঃশ্বাস পড়লো আমার । দুলাভাই চমকে পিছনে তাকালেন, আমাকে দেখেই হেসে ফেললেন ,
কোনটা ?
আজাদ ।
কাঁপা গলায় বললাম ।
আজাদের প্রতিনিধি চন্দ্র'দার সৌজন্য কপিটা খোলা হলো । মুকুলের মাহফিলের চমৎকার পাতায় বাম পাশ ঘেষে প্রায় অর্ধেকটা জায়গা নিয়ে 'এক বিকেলের গল্প' । নিচে একটু ছোট হরফে লেখা 'মোসলেহ উদ্দিন বাবুল' । সে এক অবর্ণণীয় অনুভূতি ! হাত পা ঠান্ডা হয়ে আবার গরম হয়ে গেলো । বুকের মধ্যে মাদল বাজছে দ্রিমি দ্রিম । কানে রক্ত জমে ঝাঁ ঝাঁ । এমন সময় চন্দ্র'দা অফিসে এসে ঢুকলেন , যথারীতি দেখলেন এবং পেপারটা তংক্ষণাৎ আমাকে দিয়েই দিলেন ।
আমি তক্ষুনি দে ছুট । পুকুর পাড়ে বসে খুটিয়ে খুটিয়ে পড়লাম । রেজা রায়হান বুলবুল, জাকির হোসেন বাবু, মাহবুব কবীর, আরো অনেকের লেখা । চিঠির উত্তরেও আমি । আগের বারের মতো । কলিজায় শেল মারা জবাব না । বাগবান ভাই লিখেছেন, 'তোমার গল্প বলার ধরন ভারী সুন্দর , লেখা বন্ধ করো না ।' আমি বোধহয় জীবনে এর চে' বড় কোন ভালো কিছু পাইনি ।
পরের সপ্তাহে বাংলার বাণীর শাপলা কুঁড়ির আসরে গল্প ছাপা হলো 'টম্যাটো গুড্ডু সাহিত্য সমাচার'। পরের সপ্তাহে ইত্তেফাকের 'কচি কাঁচার আসরে' ছাপা হলো গল্প 'মমতা'। সংবাদের 'খেলাঘরে' ছাপা হলো 'শীতের ছড়া' । মাস খানেক পড়ে বাংলা একাডেমীর মাসিক 'ধান শালিকের দেশে' ছাপা হলো বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রবন্ধ 'ক্যামেরা ও চোখ' । তার মাস দুই পরে চট্রগ্রামের দৈনিক জমানার সবুজ আসরে ছাপা হতে শুরু করলো একটি ধারাবাহিক সায়েন্স ফিকশন 'পেন্ডা আয়ল্যান্ড' ।

শুরু হলো দু'হাতে লেখা । তখন যেমন পত্রিকার ছড়াছড়ি, লেখাও যা পাঠাতাম, তাই ছাপা হতে লাগলো । এরপরে অন্য ইতিহাস ...




































সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৪

দুটি কবিতা ॥ ফকির ইলিয়াস






দুটি কবিতা ফকির ইলিয়াস

__________________________________________________
---------------------

দ্বিতত্ত্বের দুইখন্ড 

---------------------


একটা রাত রূপবদল করতে এসেছিলো আমার
দরোজায়। একটা চিল উড়ে গিয়েছিলো ছুঁতে
সেই রাতের রূপ। ভুল করে ফুলগুলো কাছে এসে
বলেছিলো , অজানাই থাক দিনমালা, দিনের গ্রহন।



কেউ দেখে ফেলবে জেনেও দিনেই পালাতে চেয়েছিলো
নদীদের ছায়া। তুমি পাহারার দায়িত্বে ছিলে , তবু কেনো
একটি বার বলোনি ,নদীরা দিনে ঘুমায় আর রাতে জেগে থাকে ।




------------------

গুহাজীবন 

------------------
আমার প্রতিবেশী ছিল আলখেল্লা পরা একটুকরো রাত,ডানপাশে
কয়েকটা মাকড়শা বুনছিল তাদের স্বপ্নজাল।আর শুকনো পাতার
মর্মরে বাজছিল অনাগত দিনের দ্যোতনা, কিছু সমবেত পিঁপড়ে
খুঁড়ছিল মাটি। মাঝে মাঝে এভাবে খুঁড়ে যেতে হয় - তা আমার


আগেই জানা ছিল। কালো বন্দুকটার গায়ে হেলান দিয়ে আমি
যে মমতার স্থির চিত্র আঁকতাম , সেও থাকতো বহুদূরে কারণ
এই গুহাজীবন তার কখনোই পছন্দ ছিলো না। কেবল আমিই
একটা পালিত পাঁজর সম্বল করে বেছে নিয়েছিলাম বেদনার তৎসমপর্ব।


একদিন গুহা থেকে বেরিয়ে আমি পেলাম সে এক অন্য মানব-
জীবন ! যেখানে মানুষ মাটি খুঁড়তে জানে না। দাঁড়াতে পারে না
ভালোবাসার স্বপক্ষে। দ্বেষের দ্বিতীয়জীবন নিয়ে তারা দেশ
ছেড়ে যায় - তবু সমবেত হয় না .. হতে পারে না ..হতে পারে না। 

বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৪

দুটি কবিতা ॥ ফকির ইলিয়াস



দুটি কবিতা ফকির ইলিয়াস

_________________________________

----------------------------
স্বৈরশাসিকারা যা বলছে 
---------------------------
''আরে আরে কবিতাগুলো এমন 'ফ্ল্যাট' করে পড়া হচ্ছে কেন !
বাচিক শিল্পীরা কবিতা পড়ার আগে নিতে হবে আমার পারমিশন—
আমিই পালক তুলে দেবো এর হাতে, কেটে দেবো ওর ডানা
আর কবিতাপাঠ ! দরকার হলে আমার পকেট সাংবাদিকরা
লিখবে না এসবের ক্রিটিক ''

বলতে বলতে
আমাদের চারপাশে এখন ঘুরছে অনেক স্বৈরশাসিকার ছড়ি।
'বিশ্ব বেহায়া' বলে যিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন—
তিনিও মুখ লুকোচ্ছেন পাইকারি বাজারে।

হায় হুইল বিদগ্ধ হুইল চেয়ার ! একদিন সকল দুঃশাসনকে তুড়ি
মেরে যে তুমি কাঁধে তুলে নিয়েছিলে পৃথিবীর ভার,
সেই পংক্তিও এখন মুখ থবড়ে পড়ে আছে পৃথক দরোজায়,
কয়েকটি দুষ্ট মাছি ভন ভন করছে গলিত লালা খাবে বলে।

-----------------------
পশম ও পুষ্পের গান 
-----------------------
আমি চিরকাল লিখে যেতে চাই পশম ও পুষ্পের গান
কালো কোন আকাশ পেলে
বদলে দেব সূর্যের আদল আর
বেদনার মুখাবয়বে ডুবে থাকা রোদের অসুখ-
সুখ দেব বলে কোন প্রতিজ্ঞা না করেই ঢেউগুলোকে দেবো
সমুদ্রের সোনালি সোহাগ ....

দেবো আরও অনেক কিছুই। পাতার পতন দেখে যে দুপুর
কেঁদেছিল নীরবে, আমি তার পাশে বসে
শোনাবো চন্দন বিন্দুর গল্প।মোহরের মহিমাগুলো
কারো হাতে না দিয়েই ভাসিয়ে দেবো জলে।
যে ধ্বংস আমাকে দিয়েছে বৈভব,
আমি তার সম্পূরক হয়েই গানে দেবো সুর।
যে সুর অমধুর ধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়বে
বিষাদমাখা বিকেলের গাঁয়ে।

UA-53225896-1