শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৪

হৃদয়ে বাংলাদেশ >< সৈয়দ রুম্মান




সৈয়দ রুম্মান
------------------------------------------------------------------------------------------------------------

বাম ডানে মিলে লাঠালাঠি করে
খাটাখাটি করে মজুরে;
অধিকার আছে বন্দিশালায়,
বাকিটুকু খায় মেকুরে।

চতুর তর্কে লম্ফঝম্প
পোষে অস্থির চেতনা;
বিরোধী হলেই—তুই কেউ না রে,
এ কোন নতুন বেদনা!

টুটি চেপে আছে অসহিষ্ণুতা;
অবাক বুদ্ধিবৃত্তি!
মোড়কে মোড়কে ইতিহাস জমে,
ঠোসা পড়ে পোড়ে কৃত্তি!

স্বাধিকার খোঁজে কৃচ্ছ্র সাধনা,
মিছিলে ঝান্ডা উড়িয়ে
আপন দেরাজ ভরে গোগ্রাসে
টঙ্কশালাকে গুঁড়িয়ে।

ঘর্মে কর্মে জল ভারি করে
গরীব মধ্যবিত্ত,
বিপরীতে বাস খোলা ময়দানে;
বিবমিষা ভরা চিত্ত।

এখনও আকাশে অঙ্গার দেখি,
বৃষ্টিও তাকে মোছে না,
বাক তকমায় জনপদ ভরে
বভুক্ষু রাত গোছে না।

এসো গড়ি সব ব্যবধান ভুলে,
জড়ো করে অবশেষ—
পারস্পরিক শৌর্য বীর্যে
হৃদয়ে বাংলাদেশ !

সকাল ১১.৩৯মি.
১৬ নভেম্বর ২০১৪
সেইন্ট পল্স আন্ডারগ্রাউন্ড,লন্ডন

বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৪

বিজয়ের স্মৃতিকথা >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল






বিজয়ের স্মৃতিকথা >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
০১.
১৯৭০ সাল । নভেম্বর। উপকুল জুড়ে বয়ে গেল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় । ৩০ হাজার মানুষ মরে গেলো । আমার বাড়ী ভোলা, সাগর মেখলা উপকুলীয় দ্বীপ । কিন্তু আমি ছিলাম বাণড়ীপাড়া । বানরীপাড়া ইউনিয়ন ইনষ্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র । দুলাভাই পোষ্ট মাষ্টার । তার সাথে । বন্যার তৃতীয় দিনে দুলাভাইর সাথে ভোলা রওনা দিলাম । লঞ্চে ।১২ /১৩ বৎসরের বালক আমি l হাফপেন্ট পড়ি । বরিশাল ছেড়ে ভোলার দিকে যত এগুচ্ছি, বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট । নদীর পাড়ের লোকালয়গুলোতে কোন আস্ত ঘর-বাড়ী বা সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকা কোন গাছ নাই । কালাবদর নদী পেরিয়ে ইলিশা ! কিন্তু এখানে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু ! মানুষের ফুলে ওঠা, ভেসে আসা লাশ । লাশের পরে লাশ । লাশের মিছিলের পাশ কাটিয়ে ফাক ফোকর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে লঞ্চ । অবশেষে ভোলা লঞ্চঘাট । ভোলা থেকে ১২ মাইল দুরে আমাদের বাড়ী, দৌলতখান । বাসে যেতে হয় । আমরা বলি মোটর। এক ঘন্টার পথ । কিন্তু মোটর কোথায় ! রাস্তাইতো নাই ! দুলাভাই দু'টো লম্বা লাঠি যোগাড় করে একটা আমাকে দিলেন । পানির মধ্যে লাঠি দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে পথ খুঁজে নিয়ে চলা । পথে ডোবায় ভেসে থাকা লাশ, ঝড়ে মাথা মুচড়ে যাওয়া গাছের ডগায় আটকে থাকা লাশ, দেখতে দেখতে সন্ধ্যার আধারে পথ চলা । অবশেষে বাড়ী ফেরা ।
কিন্তু বাড়ী কোথায় ! উঠোনের দুই মাথায় দুটো ঘরের একটার চিহ্নই নেই, অপরটার ভিটির উপরে থ্যাবড়ে পড়া চাল, তার নীচে অবশেষে খুঁজে পেতে পাওয়া কিছু তৈজস পত্র নিয়ে বসে আছে আমার মা আর বোন, আর জনার মা, চিরদিনের গরীব মহিলাদের সেই প্রতিনিধি, যারা কিছু নিতে নয়, এমনিতেই ভালবাসতে জানে, বিপদে পাশে থাকতে জানে ।
পরদিন সকালে আনারুল এলো । আমার সারাজীবনের একমাত্র বন্ধু, যার কাছে আমার কোন দোষ-অসমপূর্ণতা ছিলনা, আমি ছিলাম তার একান্তই মনের মতো, পারফেক্ট । আমি ভুল বললেও সেটা সে বিশ্বাসই শুধু করতোনা, সবার কাছে সত্য বলে প্রমাণও করতো । হ্যা, সেই ক্ষমতা তার ছিলো, সে ছিলো প্রকৃতিগতভাবেই ''নেতা'' ।
আনারুলের কাছেই শুনলাম, এমন মহা-প্রলয়ের পরেও আমাদের দুরবস্থা দেখার জন্য সরকারী তরফের কেউ আসেনি । মাঝে মাঝে হেলিকপ্টার উড়ে এসে কিছু রিলিফের বস্তা ফেলে যাচ্ছে, তাতে থাকছে কাঠের চাকার মতো বিস্কুট, চিনি দিয়ে বানানো গুটূলী, আর কোন কোন বস্তায় 'ছাতু' । ছাতু তো আমরা চিনতাম না, মনে করতাম মিষ্টি স্বাদের আটা ।

আনারুল ছাত্রলীগ করতো । আরেক বন্ধু মোহাম্মদ আলী করতো ইসলামী ছাত্র সংঘ । ওদের কাছে জানলাম বন্যার সময় আমাদের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান চীন সফরে ছিলেন । তাকে যখন পাকিসথানে সাইক্লোনের সংবাদটা পৌছানো হয়, তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, 'ইষ্ট অর ওয়েষ্ট ?' 'ইষ্ট' শুনে সংবাদটা তাকে আরো দুদিন পরে দেবার জন্য বলেছিলেন । কারন চীনের সাথে বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূ্র্ণ কাজ তখনো বাকী ।
০২.
১৯৭১ সাল, ৮ই মার্চ । দুপুর ০১-৩০ মিনিট । ভোলা থেকে বরিশাল যাচ্ছি লঞ্চে । লঞ্চ কালা বদর নদীর মাঝে । লঞ্চের ছাদে দুই সাদা চামড়ার বিদেশী ছোট একটা রেডিও নিয়ে বিভিন্ন ষ্টেশন ঘুরছে, আকাশবানীই বেশী । হঠাৎ করে বেজে উঠলো, 'ঢাকা বেতার কেন্দ্র, একদিনের বিরতির পর আমাদের অধিবেশন আবার শুরু হলো । এই অধিবেশন একযোগে সম্প্রচারিত হচ্ছে ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা কেন্দ্র থেকে । এখন প্রচারিত হবে গতকাল রেস কোর্স ময়দানে বাঙ্গালী জাতির অবিসম্বাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণ । ' সমস্ত উৎসুক মানুষের কান খাড়া, মন একাগ্র, বিদেশী দুজনেরও ।
০৩.
২৭ মার্চ । সন্ধেবেলা । বরিশাল পাতারহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে লেঙ্গুটিয়া বাজার । দুলাভাই সেখানে পোষ্টমাষ্টার । আমরা তিন ভাইবোনও সেখানে । দাদা (আমার বড় ভাই শামসুদ্দিন খোকন) ছুটে এসে খবর দিলেন,'একজন চায়নিজ স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার কিছু একটা ঘোষনা দিচ্ছেন, পুরোটা বোঝা যাচ্ছে না ।' দুলাভাই আর আমি ছুটলাম তা শুনতে, গণেশদের ঔষধের ফার্মেসীতে । ''আই মেজ চিয়া, হিয়ার বাই ডিক্লেয়ার, ইন্ডপেন্ডনট অব বাংলাদেশ, বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট লিডার.......' কান্নায় চোখ ভিজে গেল আমার, বুকটা ভারী হয়ে গেছে । বজারের সব লোক ভিড় করে শুনছে বিদেশী লোকটার বক্তব্য, ভাষা দুর্বোধ্য হলেও তার আবেগ স্পর্শ করছে সবার রিদয় । আমি তখন লেঙ্গুটিয়া হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ি।
০৪.
১৬ ডিসেম্বর সকাল নয়টা থেকেই পাক আর্মী সারন্ডারের প্রস্তুতি নিচ্ছল । স্বাধীন বাংলা বেতার এবং আকাশ বাণী কোলকাতা খুলে বসে আছে সারা দেশের গ্রামের মানুষ । আমরা বরিশালে, আমানতগঞ্জে, খালার বাসায় । মাহমুদিয়া মাদ্রাসার একজন তালেবে এলেম আম্মার সাথে দেখা করতে এলো । আল-বদরে ছিলো । ধার্মীক ছেলে, তার মতে এই যুদ্ধ অনিসলামিক । তাই নভেম্বরেই পালিয়েছিল বাহিনী থেকে । পাক আর্মী সারেন্ডার করবে জেনে একটু স্বস্থি পেয়েছে, আর পালিয়ে থাকতে হবে না । মুরব্বীদের দোয়া নিয়ে বিদায় নিলেন । কোথায় যাবে, সেও বলেনি, আমরাও জানতে চাইনি। জানাটা ঠিক হতোনা । তার ভরসা পাওয়াটা কদ্দুর সঠিক ছিল আজও জানতে পারিনি ।
পাঁচটা এক মিনিটে আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষরের পরে এই নর-পশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহন করলো ভারতীয় আর্মী । অবশ্য তার অনেক আগেই পাকিস্তানে থাকা বাঙ্গালীদেরকে কনসেনটেশন ক্যাম্পে জিম্মি করে ফেলেছে পাকিস্তান । আমাদের প্রতিশোধ নেয়ার পথ খোলা রইলনা ।
অবশ্য বর্তমানের মতো অবস্হা যদি থাকতো, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব যদি থাকতো অন্য কোন দল, তাহলে পরিস্থিতি অবশ্যই অন্যরকম হতো । মন ভরে পাক আর্মী আর বিহারী, দালাল হত্যা করে মনের ঝাল মিটাতে পারতাম আমরা । পাকিস্তানে আটক তিন হাজার বাঙ্গালীকে ওরা কোরবানী দিতো, তাতে আমাদের কি, ওদের অনেকে তো দেশে ফিরেও পাক-দালালীই করেছে !
কিন্তু ঐ সময়ের আমরা একফোটা বাঙ্গালী রক্তও ঝড়াতে চাইনি । দালাল আইনে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদ বোধ করেছেন ফ. কা. চৌধুরী । সবুর খানকে গোপনে অর্থ সাহায্য করেছেন বঙ্গবন্ধু । সেই বাঙ্গালী কি আছে ? এখন আছে বাংলাদেশীরা !










বেড়ে ওঠার সময় >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল







বেড়ে ওঠার সময় >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
তখন পাকিস্থানী আমল । ১৪ ফেব্রুয়ারী যে ভ্যালেনটাইন ডে, এটা তখন কেউ জানতোই না । নিজের জন্মের তারিখ বলেই দিনটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো । তখন খুব ছোট-বেলা । পোষ্ট মাষ্টার দুলাভাইর কল্যাণে পড়তে শেখার সময় থেকেই দৈনিক পত্রিকা পড়াটাও শিখে গেছি । তখন এখনকার মতো 'চাহিবামাত্র' হাতের কাছে বিভিন্ন ধরনের দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পাওয়া যেতো না । মফস্বল, থানা সদরে বাড়ী । যারা পেপার পড়তেন, তাদের জন্য পোষ্টাফিসই ছিল একমাত্র ভরসা । বাৎসরিক গ্রাহক হতে হতো এককালীন অগ্রীম টাকা পাঠিয়ে । ৫ তারিখের পেপার, লেখা থাকতো '৫ মে'৬৯ শনিবার, মফস্বল ৬ মে'৬৯ রবিবার' । তাও ডাকে আসতে আসতে হয়ে যেতো ১০ মে'৬৯ । তবু তাতেই যে কি মজা ছিল । অবশ্য তখনকার ডাক বিভাগ এখনকার মতো বেপরোয়াভাবে চিঠিপত্র হারাতো না । আমাদের পাষ্টাফিসের মাধ্যমে আসতো 'দৈনিক আজাদ' , 'দৈনিক ইত্তেফাক' আর 'মর্নিং নিউজ' । বলা বাহুল্য এক কপি করেই । আজাদের 'মুকুলের মাহফিল' আর ইত্তেফাকের 'কচি-কাঁচার আসর' পড়তাম না, গিলতাম হুমড়ি খেয়ে । আমার এই পড়ুয়া স্বভাবের জন্য খুশী হয়ে অথবা অন্য লোকের পেপার খুলে পড়তাম, এই বিরক্তিতে দুলাভাই আমাকে 'মাসিক কচি-কাঁচা'র গ্রাহক করে দিলেন । মাসিক 'খেলাঘর'ও পেতাম মাঝে মাঝে । পড়তাম, আর অবাক হয়ে ভাবতাম, এই লেখাগুলো আমার মতো মানুষেরই লেখা ! 'শিশু সাথী'র একটা ভলিউম পেয়ে গেলাম এক সময় । নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিনরাত পড়ে শেষ করলাম । হণ্যে হয়ে বই পড়তাম এবং খুঁজতাম । শশঁধর দত্তের 'দস্যু মোহণ' , আবুল কাশেমের 'দস্যু বাহরাম', 'ভুলু ডাকাত', অনেকগুলো খন্ড পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেল । ঐ সময় খোঁজ পেলাম বিদ্যুৎ মিত্রের 'কুয়াশা' সিরিজের । নেশা ধরে গেল পড়ার । মাসুদ রানা সিরিজের 'স্বর্ণমৃগ' বইটা দোলন ভাইর কাছ থেকে যোগার করে পড়ি । বইটা তখন পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করেছিল ।
বই পড়ার নেশা এমনভাবে পেয়ে বসলো যে, একটা ভালো বই পড়তে দিয়ে আমাকে দিয়ে যে কোনো কাজ করিয়ে নেয়া যেতো ।
তখন থেকেই বোধহয় লেখা-লেখির ইচ্ছাটা জেগে উঠতে থাকে আমার মনের মধ্যে । পড়তাম গদ্যের বই, কিন্তু লিখতে শুরু করলাম পদ্য । কেন যে, তা আজও বুঝি না ।
'নবীন করিব রচনা' নামের একটা রচনা লিখে ফেললাম এবং অনেক সাধনায় অর্জিত জ্ঞান বুদ্ধির দৌলতে সর্বত্র পাঠাতে লাগলাম । কিন্তু সাধু ভাষায় লেখা আমার এই চমৎকার (!) কবিতাটি কেউই ছাঁপায় না ! দৈনিক সংবাদে 'খেলাঘর' পাতা বেরুতো তখন । বড় ভাইর এক বন্ধুর নামে ডাকে 'সংবাদ' আসতে শুরু করলো । খেলাঘরের খোঁজ পেয়ে ওখানেই পাঠালাম 'নবীন করিব রচনা'র দৃঢ় প্রত্যয়টি । পরের সপ্তাহেই এলো । না কবিতা ছাপা হয়নি, চিঠির জবাবের কলামে ছাপার অক্ষরে আমার নাম ছাপা হয়েছে ঠিকানাসহ । পরিচালক জানিয়েছেন, সাধু ভাষায় লেখালেখি করতে হলে রবীন্দ্রনাথের যুগে ফিরে গিয়ে জন্ম নিতে হবে , আর অভিধান দেখে দেখে কেউ কবিতা পড়ে না । সুতরাং বর্তমান উপযোগী ভাষা এবং বাক্য দিয়ে আমাকে 'নবীন' রচনা করতে হবে, যদি লেখক হতে চাই । সুতরাং এতো সুন্দর আর পছন্দের কবিতাটি আমার মাঠে মারা গেলো !
গল্প উপন্যাস খুব পড়তাম, আগেই বলেছি । সুতরাং এবার গদ্য নিয়ে পড়লাম । একমাত্র পাঠক দুলাভাই । উনি মোটামোটি প্রশংসাই করেন, কিন্তু ছাপা না হলে লিখে কি আনন্দ হয় ! প্রথম লেখার করুন অভিজ্ঞতা ভুলতে পারিনি বলে আর পত্রিকায় লেখা পাঠাবার দুঃসাহস করিনি । অবশ্য গোগ্রাসে গল্প উপন্যাস গেলাটা বন্ধ হয়নি , বরং আরো বেড়েছে । ক্লাসিক থেকে বটতলা পর্যন্ত কিছুতে অরুচি নেই ।
তখন হাইস্কুলে পড়ি । মূক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে । তিয়াত্তরের শেষদিক । আজাদের মুকুলের মাহফিলে 'এক বিকেলের গল্প' নামে একটা গল্প পাঠালাম । গোপন রাখতে হলো বিষয়টা । যদিও পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করি না, তবু বন্ধুদের মধ্যে সাহিত্য বোদ্ধা হিসাবে আমার খুব নাম ডাক । প্রথমবার কবিতা পাঠাবার সময় একেবারে পিচ্চি ছিলাম , তাই দুলাভাই ছাড়া আর কারো জানা নাই ঐ ঘটনার কথা, কিন্তু এখন তো আমি ছোট্টটি নেই, হাইস্কুলে পড়ি, হাতে ঘড়ি, মাঝে মাঝে ফুলপেন্টও পড়ি, কাজেই ইজ্জতের ব্যাপারটাও তো আছে !
চাতক পাখীর মতো হা করে বসে থাকি পোষ্টাফিসের বারান্দায় । কখন রানার আসবে ! কিন্তু না, পরের সংখ্যায় খবর নেই । আতিপাঁতি করে খুঁজেও না পেয়ে দমে গেলাম । এবারো বোধহয় আগের মতোই ফলাফল ! মনটা বড্ড বিমর্ষ হয়ে থাকলো গোটা সপ্তাহ জুড়ে ।
পরের সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে তুমুল ঝড় বৃষ্টি, ডাক এলো না । সারা বিকেল - সন্ধ্যেটাই মাটি হয়ে গেল আমার । সারা রাত ঘুম এলো না, বিছানায় এপাশ ওপাশ করে ভোর হলো । সময় আর কাটে না । ঝড় বৃষ্টি থেমে গেছে রাতেই । রানারের অপেক্ষায় সকাল থেকে বসে আছি পোষ্টাফিসের বারান্দায় । বসে আছি তো আছি । অবশেষে এলো রানার লতিফ বল্লমের গলায় লাগানো ঘন্টা বাজাতে বাজাতে । এর আগে যে কতোবার সাইকেল রিকশার বেল বাজাবার টুংটাং শুনে চমকে উঠেছি !
ডাক খোলা হলো । সর্টিং শেষ হলো । দুরু দুরু বুকে দারুন উত্তেজনা নিয়ে দাড়িয়ে আছি দুলাভাইর পিঠ ঘেষে । অবশেষে পোষ্টম্যান বশির নানা পত্রিকাগুলো দুলাভাইর সামনে রাখলেন । ফোস করে নিঃশ্বাস পড়লো আমার । দুলাভাই চমকে পিছনে তাকালেন, আমাকে দেখেই হেসে ফেললেন ,
কোনটা ?
আজাদ ।
কাঁপা গলায় বললাম ।
আজাদের প্রতিনিধি চন্দ্র'দার সৌজন্য কপিটা খোলা হলো । মুকুলের মাহফিলের চমৎকার পাতায় বাম পাশ ঘেষে প্রায় অর্ধেকটা জায়গা নিয়ে 'এক বিকেলের গল্প' । নিচে একটু ছোট হরফে লেখা 'মোসলেহ উদ্দিন বাবুল' । সে এক অবর্ণণীয় অনুভূতি ! হাত পা ঠান্ডা হয়ে আবার গরম হয়ে গেলো । বুকের মধ্যে মাদল বাজছে দ্রিমি দ্রিম । কানে রক্ত জমে ঝাঁ ঝাঁ । এমন সময় চন্দ্র'দা অফিসে এসে ঢুকলেন , যথারীতি দেখলেন এবং পেপারটা তংক্ষণাৎ আমাকে দিয়েই দিলেন ।
আমি তক্ষুনি দে ছুট । পুকুর পাড়ে বসে খুটিয়ে খুটিয়ে পড়লাম । রেজা রায়হান বুলবুল, জাকির হোসেন বাবু, মাহবুব কবীর, আরো অনেকের লেখা । চিঠির উত্তরেও আমি । আগের বারের মতো । কলিজায় শেল মারা জবাব না । বাগবান ভাই লিখেছেন, 'তোমার গল্প বলার ধরন ভারী সুন্দর , লেখা বন্ধ করো না ।' আমি বোধহয় জীবনে এর চে' বড় কোন ভালো কিছু পাইনি ।
পরের সপ্তাহে বাংলার বাণীর শাপলা কুঁড়ির আসরে গল্প ছাপা হলো 'টম্যাটো গুড্ডু সাহিত্য সমাচার'। পরের সপ্তাহে ইত্তেফাকের 'কচি কাঁচার আসরে' ছাপা হলো গল্প 'মমতা'। সংবাদের 'খেলাঘরে' ছাপা হলো 'শীতের ছড়া' । মাস খানেক পড়ে বাংলা একাডেমীর মাসিক 'ধান শালিকের দেশে' ছাপা হলো বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রবন্ধ 'ক্যামেরা ও চোখ' । তার মাস দুই পরে চট্রগ্রামের দৈনিক জমানার সবুজ আসরে ছাপা হতে শুরু করলো একটি ধারাবাহিক সায়েন্স ফিকশন 'পেন্ডা আয়ল্যান্ড' ।

শুরু হলো দু'হাতে লেখা । তখন যেমন পত্রিকার ছড়াছড়ি, লেখাও যা পাঠাতাম, তাই ছাপা হতে লাগলো । এরপরে অন্য ইতিহাস ...




































সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৪

দুটি কবিতা ॥ ফকির ইলিয়াস






দুটি কবিতা ফকির ইলিয়াস

__________________________________________________
---------------------

দ্বিতত্ত্বের দুইখন্ড 

---------------------


একটা রাত রূপবদল করতে এসেছিলো আমার
দরোজায়। একটা চিল উড়ে গিয়েছিলো ছুঁতে
সেই রাতের রূপ। ভুল করে ফুলগুলো কাছে এসে
বলেছিলো , অজানাই থাক দিনমালা, দিনের গ্রহন।



কেউ দেখে ফেলবে জেনেও দিনেই পালাতে চেয়েছিলো
নদীদের ছায়া। তুমি পাহারার দায়িত্বে ছিলে , তবু কেনো
একটি বার বলোনি ,নদীরা দিনে ঘুমায় আর রাতে জেগে থাকে ।




------------------

গুহাজীবন 

------------------
আমার প্রতিবেশী ছিল আলখেল্লা পরা একটুকরো রাত,ডানপাশে
কয়েকটা মাকড়শা বুনছিল তাদের স্বপ্নজাল।আর শুকনো পাতার
মর্মরে বাজছিল অনাগত দিনের দ্যোতনা, কিছু সমবেত পিঁপড়ে
খুঁড়ছিল মাটি। মাঝে মাঝে এভাবে খুঁড়ে যেতে হয় - তা আমার


আগেই জানা ছিল। কালো বন্দুকটার গায়ে হেলান দিয়ে আমি
যে মমতার স্থির চিত্র আঁকতাম , সেও থাকতো বহুদূরে কারণ
এই গুহাজীবন তার কখনোই পছন্দ ছিলো না। কেবল আমিই
একটা পালিত পাঁজর সম্বল করে বেছে নিয়েছিলাম বেদনার তৎসমপর্ব।


একদিন গুহা থেকে বেরিয়ে আমি পেলাম সে এক অন্য মানব-
জীবন ! যেখানে মানুষ মাটি খুঁড়তে জানে না। দাঁড়াতে পারে না
ভালোবাসার স্বপক্ষে। দ্বেষের দ্বিতীয়জীবন নিয়ে তারা দেশ
ছেড়ে যায় - তবু সমবেত হয় না .. হতে পারে না ..হতে পারে না। 

বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৪

দুটি কবিতা ॥ ফকির ইলিয়াস



দুটি কবিতা ফকির ইলিয়াস

_________________________________

----------------------------
স্বৈরশাসিকারা যা বলছে 
---------------------------
''আরে আরে কবিতাগুলো এমন 'ফ্ল্যাট' করে পড়া হচ্ছে কেন !
বাচিক শিল্পীরা কবিতা পড়ার আগে নিতে হবে আমার পারমিশন—
আমিই পালক তুলে দেবো এর হাতে, কেটে দেবো ওর ডানা
আর কবিতাপাঠ ! দরকার হলে আমার পকেট সাংবাদিকরা
লিখবে না এসবের ক্রিটিক ''

বলতে বলতে
আমাদের চারপাশে এখন ঘুরছে অনেক স্বৈরশাসিকার ছড়ি।
'বিশ্ব বেহায়া' বলে যিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন—
তিনিও মুখ লুকোচ্ছেন পাইকারি বাজারে।

হায় হুইল বিদগ্ধ হুইল চেয়ার ! একদিন সকল দুঃশাসনকে তুড়ি
মেরে যে তুমি কাঁধে তুলে নিয়েছিলে পৃথিবীর ভার,
সেই পংক্তিও এখন মুখ থবড়ে পড়ে আছে পৃথক দরোজায়,
কয়েকটি দুষ্ট মাছি ভন ভন করছে গলিত লালা খাবে বলে।

-----------------------
পশম ও পুষ্পের গান 
-----------------------
আমি চিরকাল লিখে যেতে চাই পশম ও পুষ্পের গান
কালো কোন আকাশ পেলে
বদলে দেব সূর্যের আদল আর
বেদনার মুখাবয়বে ডুবে থাকা রোদের অসুখ-
সুখ দেব বলে কোন প্রতিজ্ঞা না করেই ঢেউগুলোকে দেবো
সমুদ্রের সোনালি সোহাগ ....

দেবো আরও অনেক কিছুই। পাতার পতন দেখে যে দুপুর
কেঁদেছিল নীরবে, আমি তার পাশে বসে
শোনাবো চন্দন বিন্দুর গল্প।মোহরের মহিমাগুলো
কারো হাতে না দিয়েই ভাসিয়ে দেবো জলে।
যে ধ্বংস আমাকে দিয়েছে বৈভব,
আমি তার সম্পূরক হয়েই গানে দেবো সুর।
যে সুর অমধুর ধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়বে
বিষাদমাখা বিকেলের গাঁয়ে।

সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মন্টির সার্ট

মোসলেহ উদ্দিন বাবুল

মন্টির সার্ট নাকি নিয়ে গেছে চোরে
তাইতো সে বাড়ীময় বন বন ঘোরে ।
'সার্ট কই সার্ট কই' কেবল চেঁচায়,
সব্বাই সার্ট খোঁজে, সেদিকে কে চায় !

চেঁচামেচি, গোলমাল, কেঁদে কেটে সারা,
'কোথা আছে সার্ট চোর !' তোলপার পাড়া ।
'এথা খোঁজো, হেথা খোঁজো, খোঁজো সবখানে,
খুঁজে দেখো কোন দেশে কোন লোক জানে !'

কোথাও পেলো না কেউ কোন যে খবর,
'খাসা সার্ট ছিলো, আহা, রংটা জবর !'
সব্বাই ফিসফাস আপসোস করে,
'কোন পথে চোর এলো, সার্ট নিতে, ঘরে !'

ছোট আপু মৌসুমী এলো সবশেষে,
মন্টির পাশে এসে বললো সে হেসে -
'সব খুঁজে দেখেছো তো, দেখেছো কি গায়ে !'
যারা ছিলো আশে পাশে, আর ডানে-বায়ে -
হা হা, হো হো, খিক খিক, কি তুমুল হাসি !
তার কাছে নস্যি যে ট্রেনেরও বাঁশী !
হেসে হেসে চিৎপাৎ, লুটোপুটি খায়,
কেউবা নিজের পেটে তবলা বাঁজায় ।

চোর খুঁজে ধুলো মাখা সব পায়ে পায়ে,
আসলে সার্ট যে আছে মন্টিরই গায়ে ।

তুই এবং তুমি


সৈ য় দ রু ম্মা ন
...................................................................................................................................................

সন্ধ্যার মাধুর্যে আজ পুরাতন এই চোখে কোন রঙ দেখা দিয়েছিলো,
কতদিন চোখাচোখি-তবু তার এতোটুকু মোহনিয়া রূপ খুঁজি নাই,
দমকা হাওয়ার স্রোতে পাল্টে যায় দৃষ্টিবোধ, কীভাবে সে পরানে পশিলো-
নিরুত্তর সংবিধান-মোনালিসা হেরে যায়-মুহুর্মুহু বিস্ময়ের ঠাঁই।
বোধের প্রাচুর্যে দৃষ্টি কীভাবেই ‘তুই’ থেকে উঠে আসে ‘তুমি’র যাদুতে-
গোধূলির মগ্ন দিন, রিকশার খোলা হুডে কাক ভেজা শ্রাবণ-সুন্দরে,
মনুব্যারেজের পরে সুগন্ধি ঘাসের ছোঁয়া, ধরে ধরে হেঁটেছি বাহুতে-
অনুভূতিহীন ছিলো। কীভাবেই সে-ই আজ তুমি হয়ে তোলে সুর ধড়ে।
কত মিহি দিন গেছে-কলেজের করিডোরে বাদামের শব্দে ভেসে ভেসে
সহজিয়া গল্পগুলো জ্যোৎস্নার আলোতে আজ মনে হয় বড় মধুময়-
নিপুণ শব্দের ভিড়ে টের পাই তোকে নয়- তোমাকেই গেছি ভালোবেসে
বিস্ময়ের হৃদে হেঁটে-নির্নিমিখে ভালোবাসি, ফের খুঁজি-অতীত অন্বয়|
কোন সে বর্তিকা এসে পাল্টে দিলো দৃষ্টিবোধ; হৃদয়ের রঙ চারিধারে-
সেই পরিচিত ঠোঁটে অনির্বাণ স্বপ্ন বুনে অন্তহীন ভালোবাসি তারে।


(চলে গেলে নিয়ে যায় সবি ২০০৫ )

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নালিশ





মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
=======================================================================

মন্ত্রী মশাই তোমার কাছে
 নালিশ আছে আমার ,
কি করে কই দুঃখের কথা,
বোতামই নেই জামার !

পায়জামার ঐ ফিতাও নেই,
নেই তো মাথার টুপি,
পেটেও যে খাবারটা নেই,
বলছি চুপি চুপি ...

শব্দ করে বলি যদি,
শত্রু পাবে সুযোগ,
বিরোধী দল তুলবে তখন
আন্দোলনের হুজুগ ।

আসলে তো দোষটা আমার নিজের পেটের ক্ষুদার,
এমন হলে ক্যামনে বাঁচি, কি করে হই উদার !

মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

অ ন্ধ কা র



সুমন নিনাদ
------------------------------------------------------------------------------------
অন্ধকারে স্বপ্ন ভাঙ্গে সপ্ন যেন ঠুনকো কাঁচঅন্ধকারে একলা ঘরে বিবেকের নগ্ন নাচঅন্ধকারে বুকের বামে সাবেক আগুনের আঁচঅন্ধকারে কফিন থেকে চুরি হয় সভ্যতার লাশতবুও সূর্য ওঠে পৃথিবীতে,কপট আলোয় ঝলসে দিতে,মহাকালের অন্তর্বাস।অন্ধকারে ধ্রুপদি সপ্নেরা তুমুল উন্মাদনায় মাতেঅন্ধকারে কারো শরীর চলে যায় অন্য কারো হাতেঅন্ধকারে দোপেয়ে মানুষ কখনোবা হায়না সাজেঅন্ধকারে আমার কানে নিঃশব্দতার আর্তনাদ বাজেতবুও অন্ধকারে সাজতে ভুত,শরীর নিজেকে করে প্রস্তুত,চোখে মুখে মেখে ফসফরাস।অন্ধকারে ধর্ম দেখায় তার ফোকলা দাতের হাসিঅন্ধকারে সুন্দরের উপমা গলে পরতে চায় ফাঁসিঅন্ধকারে প্রহরী কুকুর হানা দেয় মনিবের অন্তঃপুরেঅন্ধকারে শ্যামের বাঁশি বেজে ওঠে কোন বন্য সুরেতবুও অন্ধকারে সাজতে শ্যাম,কত রহিম আর কত রাম,
প্রতিদিন ঘরে ফিরে হয়ে লাশ।

শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৪

তোমার জন্য



চন্দনকৃষ্ণ পাল
========================================================================
তোমার জন্য খোলা ছিলো আমার এই দীর্ঘ আকাশ
ফুল পাখি আর নদী ছিলো তোমার জন্য অপেক্ষাতে,
তোমার জন্য তৈরী ছিলো খোলামাঠের উপল বাতাস
তারা ভরা আকাশ ছিলো নিরব নিঝুম অপার রাতে।

সংকোচনে ছোট্ট হলো এমন একটি দীর্ঘ আকাশ
ক্লান্ত হলো ফুল পাখি আর দীর্ঘ নদী অপেক্ষাতে,
কান্না ভেজা সুর ছড়ালো খোলামাঠের উপল বাতাস
তারা ভরা আকাশটাও ঢাকলো মেঘে সেই সে রাতে।

কেন কথা দিয়েছিলে নদী,আসবেই না ইচ্ছে তোমার যদি।

শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৪

চাঁদবতী রাত


শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ
------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সুতনুর তপশীলে অতনুর চাঁদ
অপেক্ষার আকাশে এতকাল ঝুলেছিল
স্রেফ ভাবের হরিণী,
চেতনার অলিগলিতে ছিল
আধশোয়া রমণীর আনাগোনা
চোরা জ্যোৎস্নার জ্যোতি ।

আজ চাঁদ মাটিতে নেমে এসেছে
নীলাভ অন্ধকারের মায়াবী আলোয়
আজ আমি একটি পঞ্চদশী পূর্ণিমার
পূর্ণাঙ্গ পরিচালক ।

জ্যোৎস্নারা সারারাত গলে যাবে
সুতনু রাতের শরীরে..……
আজ শুধুই একটি চাঁদবতী রাত ।

মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৪

ওবায়দুল গনি চন্দন : আমার প্রিয় মানুষ,প্রিয় স্মৃতি




মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
========================================================================
আমি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের মারিশ্যায় কর্মরত । উপজাতিয়দের সাথে যুদ্ধরত বাংলাদেশ । আমিও এই প্রক্রিয়ার অংশ । আমি তো লেখালেখিতে চিরদিনই অনিয়মিত এবং খেয়ালী । পার্বত্য চট্টগ্রামে যাবার পর থেকেই বিচ্ছিন্ন, স্বদেশ থেকে । যেখানেই থাকি, সেবা প্রকাশনীর মাসিক 'রহস্য পত্রিকা' পড়ি ই । তখন উপজাতিয় ভাষা ও সংস্কৃতির উপর একটা কোর্সে অংশগ্রহন করছি রাঙ্গামাটি সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউটে । বনরূপা বাজারের পেপার ষ্টলে 'রহস্য পত্রিকা' কিনতে গিয়ে 'কিশোর তারকালোক' ও কিনে ফেললাম এক কপি । খুব ভালো লেগে গেলো ।

কোর্স শেষে মারিশ্যায় ফিরে আসার পরে হঠাৎ করেই মনে হলো আমার তো কিছু লেখা রেডিই আছে, পাঠিয়েই দেই না কেন ! বয়ে বেড়ানোর ঝামেলা থেকে তো মূক্ত হবো ! মূক্তিযুদ্ধের উপর লেখা 'যুদ্ধ চতুর্দিকে' এবং দক্ষিন বাংলার প্রাকৃতিক আবহে একটা সাইন্স ফিকশন 'গ্রহের নাম কারকু' । যথাক্রমে 'রহস্য পত্রিকা' এবং 'কিশোর তারকালোক' এ পাঠিয়ে দিলাম । তারপর ভুলে গেলাম ।

দু'টো চিঠি পেলাম একসাথে । সৌজন্য কপিসহ রহস্য পত্রিকা এবং কিশোর তারকালোক থেকে । রহস্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ জানতে চেয়েছেন, হাসেম খানের আকা ছবি ও ইলাষ্ট্রশনসহ প্রকাশিত উপন্যাসটির সন্মানী আমি কিভাবে পেতে চাই, মনি অর্ডারের মাধ্যমে, না ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে ! কিশোর তারকালোক থেকে চিঠিটি পাঠিয়েছেন একজন সহ-সম্পাদক, তিনি লেখার জন্য অভিন্দন জানিয়ে নিয়মিত লেখক হিসাবে আমাকে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার কর্তৃপক্ষীয় প্রস্তাব দিয়ে জানতে চেয়েছেন, লেখার সন্মানী আমি কি পদ্বতিতে collection করতে চাই ।

এই সহ-সম্পাদকটিই ছিলেন ওবায়দুল গণি চন্দন । কিশোর তারকালোকে ওবায়দুল গণি চন্দনের হাত দিয়ে আমার বেশ ক'টি কিশোর উপন্যাস এবং অনুবাদ গল্প নিয়মিত গেছে । কিন্তু মুখোমুখী হলাম অনেক পরে, ১৯৯৮ সালে ।

মাসুম রহমান আকাশ তার যৌথ ছড়াগ্রন্থ 'রাজাকার' প্রকাশ করবেন সিলেটে তার নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা 'শেকড়ের সন্ধানে' থেকে । আট জন ছড়াকার, প্রত্যেকের ছড়া থাকবে নয়টি করে । আকাশ আমাকে তার পরিকল্পনা জানালো, সে এমন একজন ছড়াকার এড করতে চাচ্ছে, যে তরুন, একস্ট্রা অর্ডিনারী পার্সোনালিটি, ছড়াও হবে অনন্য-সাধারন , ঢাকার হতে হবে । এতো শর্ত ! ভাবতে বসলাম ।

আলাদিনের চেরাগ পেয়ে

পাশের বাড়ীর নাজির,

মেঝেতে যেই মারলো ঘষা

দত্যি এসে হাজির ।

দত্যি বলে-হুকুম করুন

করতে কি কি পারি ?

বসুন্ধরায় প্লট কিংবা

হোন্ডা সিভিক গাড়ী ?

বললো নাজির ওসব কিছুর

নাই প্রয়োজন নাই,

স্বাধীনতার বিরোধীদের

লিষ্টি শুধু চাই ।

দত্যি বলে 'মাফ করবেন

বুক করে ধড়ফড়,

ওরা এখন আমার চেয়েও

ভয়াল ভয়ংকর ।'

ইউরেকা !

পেয়ে গেছি । ওবায়দুল গনি চন্দন । ছড়া-ফিচার লিখেছে অনেক । এই ছড়াটাও তার, কিন্তু ছাঁপা হয়নি পারিপার্শ্বিকতার কারনে । এর চেয়ে যোগ্য আর কাকে পাবো ! আকাশকে বললাম । নির্বাচিত হয়ে গেলো ৮ জন ছড়াকার । এবং আমার পরিকল্পনা মতোই 'রাজাকার' ছড়াগ্রন্থর প্রথম নয়টি ছড়াই ছিলো আমার পছন্দের এই 'আগুন-ছড়াকার' এর । এই যৌথ-গ্রন্থের জন্য তার অন্যতম ছড়া ছিলো এই দু'টিও ....

০১.

বই

বইটা ছিল চার ফর্মার,

লেখক টিভির পারফরমার ।

লেখাতো নয় ছাই !

বাক্য গঠন শব্দ প্রয়োগ

মাথা মুন্ডু নাই ।

হায়রে আমার দেশ !

তবু নাকি সেই বইটার

ফার্ষ্ট এডিসন শেষ ।

বলি, বেশ .. বেশ ... বেশ ....

০২.

পার্টস অফ স্পিচ


সবাই জানি কোনো কিছুর
নামকে বলে নাউন,
যেমন ঢাকা টাউন ।


প্রো-নাউনের হয় ব্যবহার
একটা শুধু শর্তে ,
নাউনের পরিবর্তে ।


যখন তুমি এটা সেটা করতে
করতে কিছু পারবে,
পড়বে সেটা ভার্বে ।


এডজেকটিভ এডভার্ব আর
প্রি-পজিশন,
বলো দেখি জলদি তাদের
কী পজিশন?


কথা শোনো আমার
বইটা খোলো গ্রামার


আরো পাবে কনজাংশন
ইন্টারজ্যাকশন,
পার্টস অফ স্পিচ ওদের নিয়েই
করে যে অ্যাকশন।

আমি এই প্রথমবারের মতো গ্রীন রোডের তারকালোক কমপ্লেক্সে গেলাম, সাথে আমার ভাগ্নে আলমগীর (বর্তমানে ব্যস্ত মিউজিশিয়ান), সম্পাদক-প্রকাশক মাসুম রহমান আকাশ এবং ছড়াকার কমল আনসারী (অনুপ্রাস বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক) । সম্পাদক সাহেবের সাথে দেখা করলাম । এই পত্রিকার তালিকাভূক্ত নিয়মিত লেখক আমি, লেখা যাচ্ছে রেগুলার, অথচ সম্পাদক সাহেব আমার চেহারাই দেখেন নি ! মজার রস রসিকতা হলো । একাউন্টস সেকশনে জমে থাকা সন্মানীর টাকার হিসাবও হলো । চন্দনের সাথে তো কথা হলোই । অদেখা থাকতে যতোটা, দেখা হবার পরে আগের চেয়ে বেশী পছন্দ হয়ে গেলো আমাদের পরস্পরকে ।

এরপরে চন্দনের প্রিন্ট থেকে ইলেক্ট্রনিক এবং ইলেক্ট্রনিক থেকে প্রিন্ট মিডিয়ায় বিরতিহীন ব্যস্ততার ইতিহাস, আশাবাদ, বিরক্তি, সংগ্রাম, যখনি ইচ্ছা হতো জানাতো সে আমাকে । আমি তার কাছে ছিলাম ডায়েরীর পাতার মতো , মানুষ যেমন ইচ্ছে হলে লিখে রাখে রোজ নামচা প্রত্যাশা এবং প্রতিক্রিয়াহীন ।

ওবায়দুল গনি চন্দন দৈনিক মানবকন্ঠের ফিচার এডিটর ছিলেন। এর আগে তিনি সাড়ে ছয় বছর বাংলাভিশন ও বৈশাখী টিভিতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন। ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতে ছিলেন ডেপুটি নিউজ এডিটর।

চন্দন ৩০টির মতো টিভি নাটক লিখেছেন। চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকের গানসহ বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল লিখতেন নিয়মিত।

 চন্দন ‘অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন দুইবার। ‘থাকছি ঢাকায় সবাই ফাইন, চারশ বছর চারশ লাইন’-ছড়াগ্রন্থের জন্য তিনি এ পুরস্কার পেয়েছেন। এর আগে ২০০০ সালে সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘কান নিয়েছে চিলে’ ছড়াগ্রন্থের জন্য অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।

তারপর ক্রমশঃ ...

ওবায়দুল গনি চন্দনের প্রথমবার হাসপাতালে যাবার সংবাদটা পেয়েছি ফেসবুকে । এবার আমিই অগ্রণী হয়েছিলাম যোগাযোগে । পরের বার সংবাদটা দেখলাম টিভির স্ক্রলে । কি বলবো ! বন্ধু দিবসে তার আপলোড দেওয়া লেখাটা কেউ কি আবার শোনাবে আমাকে !!!

কারন, ওটাই ওবায়দুল গনি চন্দনের উপর সকল লেখার উপসংহার ।

পরকীয়া পড়চা

 


 হানিফ মোহাম্মদ
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
রাতের পথে হেটেছি দুঃসাহসী পদে
স্থুল পরকীয়াকে প্রেম ভেবে
সুলষ্ম প্রেমকে দু'হাতে সরিয়ে দিয়েছি
পেতলকে সোনা ভেবে
সোনাকে ভেবেছি ভুল
কুল বিসর্জণ দিয়েছি যমুনার জলে
ঘর ছেড়ে কদমতলে বেঁধেছি বাসর
দোসর ফেলে অসার জীবন করেছি আপন
সূতা ছেড়া ঘুড্ডির মত গোত্তা খেয়ে খেয়ে
বার বার তোমার পায়ে আছড়ে পড়েছি
লোক- লজ্জা- ভয় তুচ্ছ করে
স্বচ্ছন্দে তোমার কাছে করেছি আত্মসমর্পণ।
এখন যৌবনের খুঁটিতে ঘূন ধরেছে
মরচে পড়েছে জীবনের গ্রীলে
শক্ত কংক্রীট সময়ের সাথে তাল রেখে
লোনা ধরা মাটির স্তুপ
এখন যাও বললেই কি যাওয়া যায়!
তোমারতো ঘর আছে, সংসার আছে
সব আছে তোমার
আর আমি নিঃস্ব- সম্বলহীন।
প্রেম তোমাকে দিয়েছে ঘর
আমাকে দিয়েছে অঝর কান্নার সমূহ সম্ভবনা। 

রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৪

অভিমান

চন্দনকৃষ্ণ পাল

===========================================================

গাছের পাতায় লেপটে আছে তরল অন্ধকার
কাশের বনেও কুয়াশা তার স্বপন ছড়িয়েছে
নদীর শরীর আবছা কালো, জানায় নমস্কার
যুবক তোমার দুচোখে আজ বৃষ্টি জমে আছে।
দীপান্বিতার আদর ছেড়ে শীতল হাওয়া মাখো,
অভিমানের খোলস ছেড়ে দুহাতে হাত রাখো।

শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৪

আমার প্রার্থনার মন্দির


ওয়াহিদ জালাল
========================================================================
যে চোখের জল মৃত মানুষের মুখের উপর
পড়লে অলৌকিক সুন্দরে ভরে ওঠে অবাক পৃথিবী
সেই চোখের জল আর ফেলোনা অন্ধকারের উপর ।
স্বপ্নের জন্যে অমন একফোঁটা জল আমার খুব
প্রয়োজন, একদিন প্রজাপতির খোঁজে যখন বের হবো
শহরের পর শহর তারপর নামবো গায়ের হালপথ
ধরে, তখন তোমার কাছে ছুটে আসবো আমি ।

আমার নিজের কোন দীর্ঘশ্বাস নেই, তোমার থেকে
লুকিয়ে নেয়া অল্প দিগন্তই আমার, সেই কবে
একসাথে দু’জন কথা বলতে-বলতে লাফিয়ে ওঠা
বাতাসকে ছুঁয়েছিলাম, তুমি বলেছিলে, এই নাও ;
তোমাকে স্পর্শ দিলাম। সেই থেকে তোমার সেই
পরম স্পর্শই আমার জোছনামাখা বাঁশবাগান ।

পথে নামলেই তোমার পায়ের দাগ, ঝলমল
করে তোমার মুক্তার মতো দৃষ্টি, চেয়ে দেখি
সবুজ পাতাগুলো কেমন তাঁতের শাড়ি পরে তোমার
মতো তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আজকাল
তুমি আরো রূপসী হয়েছো, তোমার বুকের উপর
কাঞ্চনময় ভালবাসার প্রান্তর, আমার প্রার্থনার মন্দির ।

তুমি চোখের জল জমিয়ে রাখো আশ্বিনের চাঁদ
অশান্ত স্রোত এসে ছুঁইবো আমি মনে বড় সাধ ।

শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০১৪

স্বপ্নের পুরুষ





মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
========================================================================

ঠিক কবে থেকে,
স্মরণে আসেনা,
তোমার হাতের মধ্যে হাত
অন্য হাতে আলতো স্পর্শ, ঘাড়ে, গলায়, অস্ফুট চিবুকে...

বাঁ'কানের কাছাকাছি এসে, নম্র কন্ঠে হাওয়ায় কম্পন -
'ভালবাসি' ...
তারপর জপমালা, ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি ...

সার্টের বোতাম দু'টো
আলতো আঙ্গুলে খুলি, না লাগাই,
নিজেই বুঝিনা !
তুমি তো কখনো সেন্ডো গেঞ্জি পড়োনা ।
কলমটা গুঁজে দিই বুক পকেটের পাশে,
আজকাল সার্টে কেন পকেট থাকেনা !

'ফেরা-পথে আধ কিলো মরিচ এনো,
তুমি তো লংকা ছাড়া খেতেই পারোনা',
কাঁচা মরিচের কথা বেশী করে মনে থাকে,
ওর প্রিয় সালাদ বানাবো ।

অফিস ছুটির পরে ফিরবে 'সে',
হাত খালি, পকেটে প্যাকেট ।
মরিচটা ভুলে গেছে, এটা তার নিত্য-রুটিন !
পেন্টের পকেট থেকে আলগোছে তুলে এনে
গুঁজে দেয় ব্লাউজের ফাকে, ছোট্ট প্যাকেট !
কিট-কাট, আমার পছন্দ-চকলেট,
এটুকু সে কখনো ভোলেনা ...

এখনো কি খুকী আছি নাকি !
বোঝেনা সে, বুঝতেও চায়না

মনে মনে সারাদিন দেখা ...

এমনো তো হতে পারে ! প্রাণে থাকা অনিন্দ পুরুষ
এমনি বাস্তব হয়ে উঠে আসবে চোখের পাতায় !
সত্যি সত্যি পথে ঘাটে কখনো বা দেখা হয়ে যাবে
যার সাথে স্বপ্ন সহবাস ...

বুধবার, ২০ আগস্ট, ২০১৪

বালিকার স্বপ্ন থাকে



মাসুম রহমান আকাশ
===========================================================

বালিকার স্বপ্ন ছিল - !

অনেক স্বপ্নের ফুল
একটা একটা করে সুতো বেঁধে
মালায় গেথেছে, সাদা সাদা
                  ছয়টা ফুলের পর
রক্তরাঙা একটা গোলাপ
তারপরে কাঠালি চাঁপারা
একে একে সাজায় পশরা
তারপর রক্তজবা - !

বালিকার স্বপ্ন থাকে,
বালিকারা স্বপ্ন দিয়ে স্বপ্নকে
                        সাজায় -

জানেনা সে -
স্বপ্নগুলি একদিন
     'থাকে' থেকে 'ছিল'
            হয়ে যাবে-!

একগুচ্ছ অষ্টাদশী




নূরুজ্জামান মনি
------------------------------------------------------------------------------------------------------------
১.
প্রথমে আমার ভালবাসা নিও ৷ নবীন ফুলের
মতো নিশ্চয়ই আজো তুমি আছো সতেজ-সবুজ,
তোমার শখের ড্রেসিং টেবিল – তুমি আজো রোজ
তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে কি গো দেখো তরঙ্গ চুলের?

কার অভিশাপে জানি আমি আজ দূর পরবাসে
একাকী প্রহর যাপি, দেহের ভেতরে নেই মন –
সে আছে তোমার কাছে ছায়ার মতোন সারাক্ষণ;
ভ্রমরের মতো ডুবে রয় স্নিগ্ধ দেহের সুবাসে ৷

সেই সোনামুখী দিনগুলো মনে এলে মন ভরে
ওঠে ঘ্রাণময় ফুলে; কে নিল হরণ করে সেই
ফুলের পরাগ ৷ আমার অন্তরে আর যেন নেই
কোনো উৎসব; বিরহী বিহঙ্গ মাথা কুটে মরে ৷

তোমাকে গড়েছি আমি সখি, মনের মাধুরী দিয়ে,
চিরদিন থেকো তুমি অপরূপা, অনন্ত যৌবনা –
তোমাতে বসন্ত হোক কুসুমের সুরভিতে বোনা,
পৃথিবী সুন্দর হোক তোমার দেহের আলো নিয়ে ৷

তুমি ভাল থেকো, সুখে থেকো – অনন্ত প্রার্থনা এই –
জীবনের প্রান্তে ফের আমাদের সাক্ষাত হবেই ৷

২.
যদি আর কোনোদিন সেই চন্দ্রিল বালক হয়ে
তোমার হৃদয়ে ঢেউ জাগাতে না পারি, যদি আর
কোনো শুভক্ষণ মেলে না গো হায় তোমাকে পাবার –
তবে থাকি যেন তোমার ভুবনে আমি সুখ-স্মৃতি হয়ে ৷

একদিন চেয়ে দেখো দূরের পাহাড়ে কত মেঘ
ঘুমিয়ে রয়েছে, জানালার কাছে ফুটে রবে ফুল –
পাখিরাও গেয়ে যাবে গান সেই নিকুঞ্জে নির্ভুল;
উদাস বনান্তে সারাদিন রবে বাতাসের বেগ ৷

মনে রেখো এই পৃথিবীতে হারায় না কিছু, কোনো
স্মৃতি সূর্যাস্তের মতো হয় না বিলীন; আমিও তো
রয়ে যাব তোমার ভুবনে অপূর্ণ ইচ্ছের মতো –
সেদিন আমার গান নিজ মনে কান পেতে শোনো ৷

এক ফোঁটা অশ্রু যদি কোনোদিন তোমার চিবুক
ছুঁয়ে এসে ঠোঁটের সীমান্তে নামে – যদি কোনোদিন
মন খারাপের মেঘ তোমাকে বানায় লেশহীন,
যদি কোনো নতুন তরঙ্গ এসে ভরে দেয় বুক,

সেদিন আমার কথা মনে রেখে ভুলে যেয়ো সব,
তোমার হৃদয়ে যেনো বেঁচে থাকে প্রেমের গৌরব ৷

৩.
বৃক্ষের সকল ডালপালা যেমন আলোর দিকে
চেয়ে থাকে, তেমনি আমার মন কাঙালের মতো
তোমার রূপের দিকে চেয়ে আছে; নিজেই বিব্রত
আমি দেখে হৃদয়ের এই কাঙাল বাসনাটিকে ৷

কী রূপ তোমার! কোন সে নিপুণ রূপের ভাস্কর
গড়েছে তোমায়; যেনো গল্পে শোনা রাজদুহিতার
দেহের কিরণ তোমাতে এসেছে নেমে; বার বার
দেখলেও পিপাসা মেটে না ৷ এই মুখ নিরন্তর

আমাকে আলোক দেয় – প্রাণে ঢালে রৌদ্রের কিরণ ৷
এই গ্রীবা – জল ছলকে ওঠা হাসি, পিঠময় চুল;
পাখির ডানার মতো জোড়া ভুরু, গালে পড়া টোল,
ডালে বসা যুগল ঘুঘুর মতো একজোড়া স্তন ৷

তোমার দেহের ঘাটে ছিপ ফেলে বসে আছি, স্থির
ফাৎনার দিকে চোখ – কখন যে নড়ে ওঠে, হায়
কখন ঠোকর দেবে – জানাবে সম্মতি ৷ সে আশায়
আমার সমস্ত মন হয়ে আছে চঞ্চল-অধীর ৷

মেঘবতী হে আমার ওগো অনন্ত তৃষ্ণার জল
তোমার কিরণ-সুধা আমাতে ঝরাও অবিরল ৷

৪.
ঘর বাঁধা মানেই তো প্রেমের মরণ, সে কথা তো
জানো তুমি; বড় প্রেম কখনোই ছুটে যায় না যে
মিলনের পথে – কালি-ঝুলিমাখা সংসারের কাজে;
সে প্রেমের ঠাঁই ইতিহাসের পাতায় দেখি না তো ৷

অনন্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রাণ থাকে দূরে দূরে;
জানো তো যে ধন মিলে যায় হাতে হাতে – সব
প্রয়োজন নিমেষে ফুরোয়; পূত প্রেমের গৌরব
ধুলোয় লুটোয়; স্বপ্নের মহল যায় ভেঙে চুরে ৷

আজীবন হয়ে থাকো তাই চির যাযাবর পাখি,
ডালে ডালে উড়ে উড়ে করে যাও দয়িতের খোঁজ –
ছিঁড়ে যাবে মালা? দলে যাবে ফুল? ওতোটা অবুঝ
হয়ো নাকো তুমি ৷ কণ্ঠে রক্ত তুলে তোমায় ডাকি,

যেমন বিরহী কেকা ডাকে দূর বনে বসন্তের কালে,
যেমন আষাঢ় এলেই উন্মনা হয় ময়ূরীর মন –
তেমনি তোমাকে খুঁজি, হায়, ডেকে ফিরি অনুক্ষণ;
নীড় নয় নাই হলো আমদের বাঁধা কোনো কালে ৷

সব পাখি বাঁধে না যে ঘর, ক্ষতি কিছু নেই তাতে
ঘরহীন তুমি আমি ভেসে যাব প্রেমের মৌতাতে ৷

৫.
আমার মনেরে আমি বোঝাতে পারি না, হায় মন
সে বড় অবুঝ; যতই প্রবোধ দিতে চাই, যত বলি
আকাশের ওপারে আকাশ, তারাদের গলাগলি –
পাখিরাও কণ্ঠ মেলায়, শোনায় দাদরা-ইমন;

তুমি কেন শুধু অসম্ভব এক স্বপ্ন বুকে রাখো?
তবু মন মানে না যে, মানে না সে শাসন-বারণ;
বুকে বড় তৃষ্ণা, বড়ই পিপাসা – জানি নাতো কারণ,
স্বপ্নের ভেতর যেন পার হই অতি দীর্ঘ সাঁকো ৷

সাঁকোর ওপারে পবো তার দেখা, তাহার সাক্ষাত;
কত অভিমান জমে আছে বুকে, কত অভিযোগ –
কত প্রেম, কত বিরহের স্মৃতি – কত অনুযোগ;
মুখোমুখী বসে বলে যেতে চাই কত শত রাত ৷

আমার ভেতরে যেন আরেক মানুষ – সে পৃথক
দেহ নিয়ে করে বসবাস; মানে না প্রবোধ সে যে,
যাকে চায়, তাকে কেড়ে নিতে চায় যেন বীর সেজে –
হতে চায় হরবোলা পথহারা পথের কথক ৷

মনের অলিন্দে পড়ে আছে তার দেহের সুবাস;
দেহ নয়, তবু পাই তার স্নিগ্ধ গ্রীবার উদ্ভাস ৷


পাইনি আজও


আবু ইশতিয়াক
========================================================================
তন্ন তন্ন সারা শহর-
পার্ক, সিনেপ্লেক্স, রেস্তোরা,
অভিজাত্ আবাসন, বনেদি সপিং মল,
নিষিদ্ধ পাড়া, ঘিঞ্জি পল্লী
কোত্থাও নেই!
পদ্মা পাড়, ঝিরি ঝিরি দখিণা বাতাস,
বেঞ্চে শিল্প,
শিল্পের উপর বসে কথকতা।
ওখানেও নেই।

খুঁজেছি নির্নিমিখ
বুকে আঁকা সৌম্য কান্তি,
উন্মুক্ত,-
বাতাস, পাখ-পাখালী নিস্প্রোভো এগোই
বর্তমান যে অতীতে বিলিন হয়
তা অর্বাচীন।
বটগাছ স্থির অবিচল-
দেখেছিল কোন এক সময়,
মনে পড়ে, পড়ে না এমন!

নিতম্ব ছোঁয়া ঘন কালো চুল,
সজ্জিত কেশ- চুড়ো-খোঁপা,
খোঁপাতে হলুদ গাঁদা।
ঠোঁটে মেরুন লিপিস্টিক,
হাতে কাঁচের কাঁকন,
কপালে মেরুন টিপ-
বিন্দুর কাছাকাছি;
মৃগ আঁখি, আঁখিতে কাজল-
ত্রিকোণ থেকে কিঞ্চিত এগিয়ে।
পরনে তাঁতের সাড়ী - কাঁচা হলুদ,
লাল পাড়। উর্বশী গড়ন, নির্মল পেলব ত্বক,
খাত, গিরি-খাত- নদীর মতন।
হঠাৎই সবল ঢেউ, জলতরঙ্গ বাজে!
অবিরত অন্বেষণে অবসাদ অভি-গ্রস্ত,
তবু পাইনি আজও টাইম মেশিন নেই বলে।

তোমাকে মনে পড়ে



আবদুল্লাহ আনসারী
------------------------------------------------------------------------------------------------------------
তোমাকে মনে পড়ে-
তোমাকে মনে পড়ায় প্রাত্যহিকতা, নিয়মের ভেতর নিয়ম
অবাধ চলাচলের স্বাধীনতার জন্যে নয়
মানচিত্রের জন্যে নয়
অবহেলিত জনগোষ্ঠিকে উদ্ধারের জন্যে নয়-
একক, অদ্বিতীয় হিসাবে সবার মাঝে আলাদা করে দেয়ার জন্য।

তোমাকে মনে পড়ে-
কারণ তুমি পিতা, সে জন্য নয়-
সে কথা জানে সকল লতা গুল্ম ও
তুমি পিতা এবং অভিবাবক।
আমার স্বাধীনতার যথাযথ পুরস্কার তোমাকে দেয়নি
দাসত্তের অভ্যাসে লালিত আমাদের স্বাধীনতা পোষায় না।

তোমাকে বড্ড মনে পড়ছে আজ-
তুমি অকারণ এবং অযৌক্তিক ভালোবেসেছো,
বড্ড বেশি রকম ভালোবেসেছো,
প্রচন্ড ভালোবেসেছো--

তোমাকে মনে পড়ে--
তুমিই আমাকে বাংগালী হওয়ার অধিকার দিয়েছো
তুমি আমাকে দিয়েছো
বোশেখের তপ্ত দুপুরে ঘর পালিয়ে
আম বাগানে কৈশোর হারানোর স্বাধীনতা,
যৌবনে প্রচন্ড বিদ্রোহী হতে, প্রতিবাদে সোচ্চার হতে, হুনকারিতে, পেটানো লোহার মতো শক্ত এবং সর্বোপরি মানবিক হতে, সোনার মানুষ হতে।

পিতা-- আমার পিতা, আমার অবিভাবক
আজ যৌবনের প্রখর রোদে দাড়িঁয়ে আমি
ছায়াহীন জলন্ত সূয্যের নীচে, চারদিকে ক্ষুদারত শকুণ

কবি দিলওয়ার এবং আমার কিছু স্বপ্নকথা

    
        
মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
========================================================================
সময়টা সম্ভবত: ১৯৯৭ । ১৯৯৮ ও হতে পারে ! ‘শেকড়ের সন্ধানে’ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রকাশনা সংস্থার চেয়ারম্যান, বিশিষ্ঠ সাংস্কৃতিক তরুন ব্যক্তিত্ব মাসুম রহমান আকাশ আমাকে বললো,                                                                                   ‘দাদা,কবি দিলওয়ার কে সম্বর্ধনা দেবো ! আপনিও এটেন্ড করতে হবে !’                                                                        আমি চমৎকৃত হলাম ! সেই ক্লাশ টেনে পড়ার সময়ই আমি কবি দিলওয়ার কে নিয়ে ছড়া লিখেছিলাম,সুদুর বরিশালের সাগর মেখলা দ্বীপ ভোলার প্রত্যন্ত পল্লী থেকে ! সম্ভবত চৌধুরী আলী আশরাফের সম্পাদিত একটা ম্যাগাজিনে ছাঁপা হয়েছিল সেটা ! সৈয়দ নাহাস পাশার সাথে মিতালীর সূত্রপাত সেখানেই । আমার স্বপ্ন-পুরুষ, ছড়া,কবিতা,গদ্যে একমাত্র জীবন্ত কিংবদন্তী ‘দিলওয়ার’ ! তাকে মুখোমুখি দেখবো, তার পাশে বসে কথা শুনতে পাবো, শিহরিত হলাম ! আমার সম্মতি-অসম্মতির প্রশ্নটাই অবান্তর ! হোটেল অনুরাগের দোতলায় ছিলো অনুষ্ঠান ! মাসুম রহমান আকাশ এর সাথে কিছু টগবগে সম্ভাবনাময় তরুন সাহিত্য কর্মী ছিলেন অনুষ্ঠানে ! শামসাদ হুসাম,(লেখক,সাংবাদিক,নারী উন্নয়ন কর্মী) আমাদের শামসাদ আপার সাথে আমিও দিলওয়ার এর পাশে বসতে পারছি ! অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম ! আমার দ্বিতীয় প্রকাশিত বই ! ‘অর্জুন,ফিরে এসো’র কপি শামসাদ আপার হাতে ! গল্পটা যুগভেরী,র সাপ্তাহিক পাতায় প্রথম ছাঁপা হয়েছিল আপা’র মনোনয়নেই (তিনি তখন যুগভেরীতে কাজ করতেন)! অনুষ্ঠান শুরু হবার পরে ফুলের তোড়া দেয়া হলো আমাদের তিনজনকে ! আজ ভাবতে গেলে আমি সংকুচিত হয়ে যাই, কিভাবে কবি দিলওয়ার এর পাশাপাশি বসে সম্বর্ধনা নিলাম ! আমিতো শামসাদ হুসাম এর পাশে বসে সম্বর্ধিত হবার যোগ্যতাও অর্জন করতে পারিনি, অথচ আশ্চর্য! কবি’র মধ্যে এমন কোন প্রতিক্রিয়াই কাজ করেনি ! আমি ‘তাঁর’ হাতে আমার বই দিলাম ! তিনি একান্ত আপনজন,বহুদিনের পরিচিত স্নেহাস্পদের মতো আচরন করলেন আমার সাথে ! অর্জুনের জন্মান্তরে ‘বৃহন্নলা’র গল্প শোনালেন মৃদুস্বরে ! পাশাপাশি বসে, বন্ধুর মতো ! অনেক কথা । যা আমার জানা ছিলনা আগে !আমি ভাবতেই পারছিনা আমার অবাক লাগেনি কেন ! কোন মন্ত্রে সুরক্ষিত ছিলেন তিনি ! মহীরুহ হয়েও সামান্য তৃণকে সম মর্যাদায় তুলে নিতে পেরেছেন ! অন্তত: ঐ সময়ের জন্য!                                                     এরপর স্বর্গের ভগবান মর্তের অবতার কৃষ্ণ হয়ে গেলেন ! আমরা তো সুবল - সুদাম ! ভগবান তখন আমাদের সখা ! কবি আবিদ ফয়সাল, কমল আনসারী, মোহসীন মাহমুদ, মতিউল ইসলাম মতিন সহ সম্ভাবনাময় তারুণ্যের ভীড়ে প্রিয় কবিকে একটুও আলাদা মনে হয়নি আমার ! এটা আমার জন্য একটা বড় অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, এবং মিরাকল যে ঐ অনুষ্ঠান, ঐ সময় এবং ঐ স্মৃতি আমার জীবনে এসেছিল ! কিশোর বেলায় যার কবিতা-ছড়া পড়ে তাকে মনে হতো দেবদুত; যাকে স্পর্শ করা যায় না, চোখের মণিতে পুরোটা বোধহয় ধারণ করাও যাবে না, তাকে প্রথম দেখায় ই আমি কিভাব তাঁর আত্মস্থ হয়ে গেলাম ! মানুষের এমন সম্মোহনী ক্ষমতা কি থাকে !         এখন,                                                                                                                                                          আবার তিনি দেবদুত হয়ে গেলেন !                                                                                                                       দৃশ্যাতিত, স্পর্শাতিত, শ্রদ্ধার, ভালোবাসার সেই দেবদুত !                                                                                           এখন ভাবী, আসলে কি আমি তাকে দু’চোখের মণিতে ভরিয়ে নিয়েছিলাম ! আমি কি তার হাতে বই তুলে দিয়ে স্পর্শ করতে পেরেছিলাম তার পদযুগল ! তিনি কি সত্যিই আমার পিঠে-কাঁধে ছুঁইয়েছিলেন তার সুনীল করতল! আমার বিশ্বাস করতে সাহস হয়না ! আমার স্বপ্নের ছবি বোধহয় এটা ! আমি তো এতোটা পাবার যোগ্য না ! সম্ভবত; এই সময়ের কোন লেখকই না !

বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৪

বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত তিনটি কবিতা ॥ ফকির ইলিয়াস







বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত তিনটি কবিতাফকির ইলিয়াস



জন্মের অধিক যদি

জন্মের অধিক যদি থাকে কোনো অমর বিস্ময়
সবুজের পুস্পকোষে আলোরেখা ঢেউ তুলে বলে
এ মাটির স্মৃতিভূমে তাঁর ছায়া দীপ হয়ে জ্বলে
এখনো আকাশ নুয়ে বলে জয় - বাংলার জয়।

লগ্ন রোদের মন পোড়ে , আর পোড়ায় আষাঢ়
পরিচয় খুঁজে খুঁজে নদী যায় দক্ষিণের বনে
ফিরে এলে দেখা হবে মানচিত্রে, গ্রহের মৈথুনে
বুকের উত্তাপে বাড়া উদ্ভাসিত প্রজন্মের হাড়।

ঋতুর বৈচিত্র্যে লেখা যে জীবন মানুষের গানে
ভরে ওঠে প্রতিদিন সুখে-দু:খে খাল বিল মাঠে
ধানের রোপণে আর শিশুদের প্রিয় শব্দপাঠে
স্বপ্ন স্বাধীন হাওয়া বয় ধীরে , মেঘ -প্রাণে প্রাণে।

যে নাম থেকেই যাবে বাংলায় , গোটা বিশ্বলোকে
'মুজিব' 'মুজিব' বলে মুক্তিকামী মানুষের ডাকে।






যেভাবে বরণ করি জলের কফিন

আমাকে বার বার হত্যা করে পনেরোই আগষ্টের ভোর। কিছু
উন্মুল জল এসে ঝাপটা দেয় মুখমন্ডলে । আর বলে , জাগো
হে পথিক ! দূরের ঘোর, সহযাত্রী তোমার। যেতে হবে , নদী
ও নিদ্রা পেরিয়ে। যেতে হবে, বর্ষার বৃত্ত ও বসন্তের পরিধির
ওপারে। যেভাবে ঝড় যায় । যেভাবে ঋতু যায় । যেভাবে ......

আমি দাঁড়িয়ে থাকি। তাকাই তৃণমণ্ডলের দিকে। খুব বেশী
ঘনিষ্ট ছিল যে আকাশ , দেখি - সে ও ছেড়ে যাচ্ছে ছায়া ও ছন্দ
খুব বেশী মেঘ জমছে। বৃষ্টি হবে জানি । সে বৃষ্টির জল আবারও
স্পর্শ করবে পিতার কফিন। কিছু মৃত্যু বিদায় নেবার পর
........আবারও এই বাংলায় জন্ম নেবে কিছু জন্মান্তর।





শোকের সোনালি পয়ার

সাতখণ্ড আকাশ পেরিয়ে আগস্টের ছায়াতলে এসে
দাঁড়াই। একটি সিঁড়ি পড়ে আছে রক্তাক্ত। একটি সিগ্রেট-পাইপ হাতে,
নিথর পড়ে আছে গোটা বাংলাদেশের শবদেহ। কয়েকটি শকুন ধানমন্ডি
বত্রিশ নাম্বারের বাইরে করছে পায়চারী।

শেয়ালেরা এরকমই হয়। কিংবা হায়েনারা ...
একাত্তরে এভাবেইতো ওরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সবুজ
বাংলাদেশ আর অন্তঃস্বত্তা নারীর উপর, বড় নির্মমতায়
মেলে দিয়েছিল বর্বরতার সর্বশেষ পাখনা।

মানুষ ভুলে নি দিন। ২৫ মার্চের কালোরাত অথবা
১৫ আগস্টের বিভীষিকাময় ভোরের থাবা ! কী এক
নষ্ট-স্মৃতির ডানা, ঝাপটায় আজও প্রজন্মের চারপাশে !


সাতখণ্ড আকাশ পেরিয়ে স্পর্শ করি মেঘনার উত্তাল
ঢেউ। ডাক শুনি।
‘একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠধ্বনি, প্রতিধ্বনি’...

শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

অব্যাক্ত ভালবাসার ক্ষণ



দী প ঙ্ক র বি শ্বা স                           
========================================================================

ভালবাসার সচ্ছ শব্দধ্বনি বাজে হৃদয় মন্দিরে!
না লাগে স্বস্তি না লাগে অস্বস্তি
রয়েছে অনুভূতিতে জড়ায় জীবনের পরিক্রমায়
সে এক অনুভবের রানী।
তার চাঁদিনী বদন, 
কাজল টানা হরিণী আঁখি, 
রক্তিম দুঠোটের আলপনা এঁকেছি
হৃদয়ের সারা গায়...
আমি তার চরণে পরা সজারু চলা 
শব্দের নুপুর ধ্বনি শুনি অনুভবের স্পষ্ট ভুমিকায়।
সন্ধ্যা উদাসী সমীরণে
সবুজ শ্যামল দূর্বাবনে
বসা এক কুমারীর দৃষ্টিপটে লুকিয়ে দেখেছি
ভালবাসার মোহনায় চোখের পাতায়
মাতন্ড দোল খেলা!
হয়ত সেও ভালবাসে।
নয়'ত ভালবাসার সিক্ত আবেশে
ভেসে চলেছে অজানা কোন এক হৃদয়পুরে।
তার সেই ভালবাসার বিরচিত সমনে রমন মেলা
গোছালো বসনে সারাক্ষণি বশীভূত
থাকে তার শরীর প্রেম আবেশে...
সেখানেই আমার অপ্রতুল ভাল লাগার
তীব্র অাকর্ষণ অনুসরণ করে তাকে বেস-ভুষণে...। 
সেই তো না বলা হীনমন্যতা।।

প্রয়োজন

জাকির মোহাম্মদ
========================================================================
প্রয়োজন শেষ হয় না
তার রেশ থেকে যায়
হাটে-ঘাটে-মাঠে
জীবনের অলিতে গলিতে পলিতে
ক্যাম্পাসের ছোট সেই ইটের স্পর্শে
প্রয়োজন প্রতারক নয় সময়ের
যতটুকু জীবন
ক্ষণকাল এইতো
নো প্রবলেম,এই তো জীবন
জীবনের প্রত্যাশা যখন
সময়ের এভারেস্ট ছোঁয়
দেখি থালা-বাসনের শব্দে
হিটলারের গোঁপ কেঁপে ওঠে
তারপর আসে দৈনিক প্রয়োজন
একবার ঘটা করে প্রয়োজন আযোজন করে
কপাট আঁটা দরজায় ঢেউ তুলবে
ভোর এসেছিল তার কল্পনার হালতে
আদতে এখানে গোতা খায়
জীবনের নান্দনিক প্রেমের তোফান
সব প্রয়োজন শেষ হয় না
কিছু বাকি থাকে সময়ের খাতায়
কিছুবা লুকিয়ে থাকে বর্ডারের ওপাশে
কৌশলিক আয়োজনে বিচিত্র প্রয়োজনে।

মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০১৪

একজন কবির কলম বিক্রি হবে



সুমন নিনাদ
=================================

একজন কবির কলম বিক্রি হবে নিলামে
কিনবেন নাকি কেউ? আছে কারোর বুকের পাটা?
আছেন কোন শিল্প গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির মালিক?
কিংবা কোন কোন জাহাজের ব্যাপারী-
আছেন কোন নেতা কিংবা অভিনেতা?
কিংবা কোন প্রভাবশালী আমলা?

একজন কবির কলম বিক্রি হবে-কিনবেন নাকি কেউ?
কোন ব্যক্তির পক্ষে একা তা কেনা একটু ধৃষ্টতাই দেখায়।
কোন দেশ, সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠান ভেবে দেখবেন নাকি বিষয়টা?
বিশ্বব্যাংক কিংবা জাতিসংঘ?
আমেরিকা কিংবা রাশিয়া?
কিংবা কোন অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবিহিনী?

আচ্ছা, কবিকে কি কেউ একবারও জিজ্ঞাসা করেছেন-
তিনি তার ঐ কলমের বিনিময়ে কত টাকা দাবী করছেন?
কী এমন দুস্প্রাপ্য হীরের টুকরো আছে সেই কলমের মাথায়?
নাকি ইউরেনিয়ামের কালি নিঃসৃত হয় সে কলম দিয়ে?

না, কবির কলমে হীরের টুকরো বা ইউরেনিয়ামের কালি কিছুই নাই।
না, কবির তিনটাকার কলমটি কিনতে কোনধরনের অর্থেরই প্রয়োজন নাই।  
না, নিলামে অংশ নেবার জন্য আপনাকে নেতা, অভিনেতা কিংবা
শিল্পগ্রুপের মালিক কোনটাই হতে হবেনা।

তাহলে কী চান সেই অখ্যাত কবি  তিনটাকার কলমের বিনিময়ে?

বিশ্বস্ত সূত্রে প্রকাশ-
কবি তার কলমটি বেচবেন শুধুমাত্র একটি সুখী বাংলাদেশের বিনিময়ে।
যে বাংলাদেশে কোন ক্ষুধার্ত মানুষ না খেয়ে মরবেনা।
যে বাংলাদেশে সকল শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা সময়মত পরিশোধ করা হবে।
যে বাংলাদেশে রাজনীতিকেরা ক্ষমতা আর চেয়ারের টান ভুলে
সত্যিকারের দেশপ্রেম বুকে লালন করবে।
যে বাংলাদেশে কোন বৃদ্ধ পিতামাতার অযত্নে আর অবহেলায়
মৃত্যু হবেনা কিংবা বৃদ্ধাশ্রমের জানালা ধরে কাঁদতে হবেনা।
যে বাংলাদেশে কোন হত্যা-গুম-খুন থাকবেনা,থাকবে স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা।
যে বাংলাদেশে সন্ত্রাস আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরন অনশন হবে।
যে বাংলাদেশে একটি শ্লোগান থাকবে এবং সেই শ্লোগান শুনলেই
সকল দল, ধর্ম, মতবাদ ও মতভেদ ভুলে- ১৬ কোটি মানুষ এক সুরে

ঐকতানের গান গেয়ে লাল সবুজের পতাকার নিচে এসে সমবেত হবে। 
UA-53225896-1