বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৪

বেড়ে ওঠার সময় >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল







বেড়ে ওঠার সময় >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
তখন পাকিস্থানী আমল । ১৪ ফেব্রুয়ারী যে ভ্যালেনটাইন ডে, এটা তখন কেউ জানতোই না । নিজের জন্মের তারিখ বলেই দিনটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো । তখন খুব ছোট-বেলা । পোষ্ট মাষ্টার দুলাভাইর কল্যাণে পড়তে শেখার সময় থেকেই দৈনিক পত্রিকা পড়াটাও শিখে গেছি । তখন এখনকার মতো 'চাহিবামাত্র' হাতের কাছে বিভিন্ন ধরনের দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পাওয়া যেতো না । মফস্বল, থানা সদরে বাড়ী । যারা পেপার পড়তেন, তাদের জন্য পোষ্টাফিসই ছিল একমাত্র ভরসা । বাৎসরিক গ্রাহক হতে হতো এককালীন অগ্রীম টাকা পাঠিয়ে । ৫ তারিখের পেপার, লেখা থাকতো '৫ মে'৬৯ শনিবার, মফস্বল ৬ মে'৬৯ রবিবার' । তাও ডাকে আসতে আসতে হয়ে যেতো ১০ মে'৬৯ । তবু তাতেই যে কি মজা ছিল । অবশ্য তখনকার ডাক বিভাগ এখনকার মতো বেপরোয়াভাবে চিঠিপত্র হারাতো না । আমাদের পাষ্টাফিসের মাধ্যমে আসতো 'দৈনিক আজাদ' , 'দৈনিক ইত্তেফাক' আর 'মর্নিং নিউজ' । বলা বাহুল্য এক কপি করেই । আজাদের 'মুকুলের মাহফিল' আর ইত্তেফাকের 'কচি-কাঁচার আসর' পড়তাম না, গিলতাম হুমড়ি খেয়ে । আমার এই পড়ুয়া স্বভাবের জন্য খুশী হয়ে অথবা অন্য লোকের পেপার খুলে পড়তাম, এই বিরক্তিতে দুলাভাই আমাকে 'মাসিক কচি-কাঁচা'র গ্রাহক করে দিলেন । মাসিক 'খেলাঘর'ও পেতাম মাঝে মাঝে । পড়তাম, আর অবাক হয়ে ভাবতাম, এই লেখাগুলো আমার মতো মানুষেরই লেখা ! 'শিশু সাথী'র একটা ভলিউম পেয়ে গেলাম এক সময় । নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিনরাত পড়ে শেষ করলাম । হণ্যে হয়ে বই পড়তাম এবং খুঁজতাম । শশঁধর দত্তের 'দস্যু মোহণ' , আবুল কাশেমের 'দস্যু বাহরাম', 'ভুলু ডাকাত', অনেকগুলো খন্ড পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেল । ঐ সময় খোঁজ পেলাম বিদ্যুৎ মিত্রের 'কুয়াশা' সিরিজের । নেশা ধরে গেল পড়ার । মাসুদ রানা সিরিজের 'স্বর্ণমৃগ' বইটা দোলন ভাইর কাছ থেকে যোগার করে পড়ি । বইটা তখন পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করেছিল ।
বই পড়ার নেশা এমনভাবে পেয়ে বসলো যে, একটা ভালো বই পড়তে দিয়ে আমাকে দিয়ে যে কোনো কাজ করিয়ে নেয়া যেতো ।
তখন থেকেই বোধহয় লেখা-লেখির ইচ্ছাটা জেগে উঠতে থাকে আমার মনের মধ্যে । পড়তাম গদ্যের বই, কিন্তু লিখতে শুরু করলাম পদ্য । কেন যে, তা আজও বুঝি না ।
'নবীন করিব রচনা' নামের একটা রচনা লিখে ফেললাম এবং অনেক সাধনায় অর্জিত জ্ঞান বুদ্ধির দৌলতে সর্বত্র পাঠাতে লাগলাম । কিন্তু সাধু ভাষায় লেখা আমার এই চমৎকার (!) কবিতাটি কেউই ছাঁপায় না ! দৈনিক সংবাদে 'খেলাঘর' পাতা বেরুতো তখন । বড় ভাইর এক বন্ধুর নামে ডাকে 'সংবাদ' আসতে শুরু করলো । খেলাঘরের খোঁজ পেয়ে ওখানেই পাঠালাম 'নবীন করিব রচনা'র দৃঢ় প্রত্যয়টি । পরের সপ্তাহেই এলো । না কবিতা ছাপা হয়নি, চিঠির জবাবের কলামে ছাপার অক্ষরে আমার নাম ছাপা হয়েছে ঠিকানাসহ । পরিচালক জানিয়েছেন, সাধু ভাষায় লেখালেখি করতে হলে রবীন্দ্রনাথের যুগে ফিরে গিয়ে জন্ম নিতে হবে , আর অভিধান দেখে দেখে কেউ কবিতা পড়ে না । সুতরাং বর্তমান উপযোগী ভাষা এবং বাক্য দিয়ে আমাকে 'নবীন' রচনা করতে হবে, যদি লেখক হতে চাই । সুতরাং এতো সুন্দর আর পছন্দের কবিতাটি আমার মাঠে মারা গেলো !
গল্প উপন্যাস খুব পড়তাম, আগেই বলেছি । সুতরাং এবার গদ্য নিয়ে পড়লাম । একমাত্র পাঠক দুলাভাই । উনি মোটামোটি প্রশংসাই করেন, কিন্তু ছাপা না হলে লিখে কি আনন্দ হয় ! প্রথম লেখার করুন অভিজ্ঞতা ভুলতে পারিনি বলে আর পত্রিকায় লেখা পাঠাবার দুঃসাহস করিনি । অবশ্য গোগ্রাসে গল্প উপন্যাস গেলাটা বন্ধ হয়নি , বরং আরো বেড়েছে । ক্লাসিক থেকে বটতলা পর্যন্ত কিছুতে অরুচি নেই ।
তখন হাইস্কুলে পড়ি । মূক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে । তিয়াত্তরের শেষদিক । আজাদের মুকুলের মাহফিলে 'এক বিকেলের গল্প' নামে একটা গল্প পাঠালাম । গোপন রাখতে হলো বিষয়টা । যদিও পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করি না, তবু বন্ধুদের মধ্যে সাহিত্য বোদ্ধা হিসাবে আমার খুব নাম ডাক । প্রথমবার কবিতা পাঠাবার সময় একেবারে পিচ্চি ছিলাম , তাই দুলাভাই ছাড়া আর কারো জানা নাই ঐ ঘটনার কথা, কিন্তু এখন তো আমি ছোট্টটি নেই, হাইস্কুলে পড়ি, হাতে ঘড়ি, মাঝে মাঝে ফুলপেন্টও পড়ি, কাজেই ইজ্জতের ব্যাপারটাও তো আছে !
চাতক পাখীর মতো হা করে বসে থাকি পোষ্টাফিসের বারান্দায় । কখন রানার আসবে ! কিন্তু না, পরের সংখ্যায় খবর নেই । আতিপাঁতি করে খুঁজেও না পেয়ে দমে গেলাম । এবারো বোধহয় আগের মতোই ফলাফল ! মনটা বড্ড বিমর্ষ হয়ে থাকলো গোটা সপ্তাহ জুড়ে ।
পরের সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে তুমুল ঝড় বৃষ্টি, ডাক এলো না । সারা বিকেল - সন্ধ্যেটাই মাটি হয়ে গেল আমার । সারা রাত ঘুম এলো না, বিছানায় এপাশ ওপাশ করে ভোর হলো । সময় আর কাটে না । ঝড় বৃষ্টি থেমে গেছে রাতেই । রানারের অপেক্ষায় সকাল থেকে বসে আছি পোষ্টাফিসের বারান্দায় । বসে আছি তো আছি । অবশেষে এলো রানার লতিফ বল্লমের গলায় লাগানো ঘন্টা বাজাতে বাজাতে । এর আগে যে কতোবার সাইকেল রিকশার বেল বাজাবার টুংটাং শুনে চমকে উঠেছি !
ডাক খোলা হলো । সর্টিং শেষ হলো । দুরু দুরু বুকে দারুন উত্তেজনা নিয়ে দাড়িয়ে আছি দুলাভাইর পিঠ ঘেষে । অবশেষে পোষ্টম্যান বশির নানা পত্রিকাগুলো দুলাভাইর সামনে রাখলেন । ফোস করে নিঃশ্বাস পড়লো আমার । দুলাভাই চমকে পিছনে তাকালেন, আমাকে দেখেই হেসে ফেললেন ,
কোনটা ?
আজাদ ।
কাঁপা গলায় বললাম ।
আজাদের প্রতিনিধি চন্দ্র'দার সৌজন্য কপিটা খোলা হলো । মুকুলের মাহফিলের চমৎকার পাতায় বাম পাশ ঘেষে প্রায় অর্ধেকটা জায়গা নিয়ে 'এক বিকেলের গল্প' । নিচে একটু ছোট হরফে লেখা 'মোসলেহ উদ্দিন বাবুল' । সে এক অবর্ণণীয় অনুভূতি ! হাত পা ঠান্ডা হয়ে আবার গরম হয়ে গেলো । বুকের মধ্যে মাদল বাজছে দ্রিমি দ্রিম । কানে রক্ত জমে ঝাঁ ঝাঁ । এমন সময় চন্দ্র'দা অফিসে এসে ঢুকলেন , যথারীতি দেখলেন এবং পেপারটা তংক্ষণাৎ আমাকে দিয়েই দিলেন ।
আমি তক্ষুনি দে ছুট । পুকুর পাড়ে বসে খুটিয়ে খুটিয়ে পড়লাম । রেজা রায়হান বুলবুল, জাকির হোসেন বাবু, মাহবুব কবীর, আরো অনেকের লেখা । চিঠির উত্তরেও আমি । আগের বারের মতো । কলিজায় শেল মারা জবাব না । বাগবান ভাই লিখেছেন, 'তোমার গল্প বলার ধরন ভারী সুন্দর , লেখা বন্ধ করো না ।' আমি বোধহয় জীবনে এর চে' বড় কোন ভালো কিছু পাইনি ।
পরের সপ্তাহে বাংলার বাণীর শাপলা কুঁড়ির আসরে গল্প ছাপা হলো 'টম্যাটো গুড্ডু সাহিত্য সমাচার'। পরের সপ্তাহে ইত্তেফাকের 'কচি কাঁচার আসরে' ছাপা হলো গল্প 'মমতা'। সংবাদের 'খেলাঘরে' ছাপা হলো 'শীতের ছড়া' । মাস খানেক পড়ে বাংলা একাডেমীর মাসিক 'ধান শালিকের দেশে' ছাপা হলো বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রবন্ধ 'ক্যামেরা ও চোখ' । তার মাস দুই পরে চট্রগ্রামের দৈনিক জমানার সবুজ আসরে ছাপা হতে শুরু করলো একটি ধারাবাহিক সায়েন্স ফিকশন 'পেন্ডা আয়ল্যান্ড' ।

শুরু হলো দু'হাতে লেখা । তখন যেমন পত্রিকার ছড়াছড়ি, লেখাও যা পাঠাতাম, তাই ছাপা হতে লাগলো । এরপরে অন্য ইতিহাস ...




































৬টি মন্তব্য:

  1. সেই ইতিহাস কাছ থেকে দেখার ও পাঠক হবার পরম সৌভাগ্যবান হতে পেরে নিজেকে ধন্য করতে পেরেছি বাবুল ভাই। আল্লাহ্‌ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুক,এটাই আমার প্রার্থনা ...

    উত্তরমুছুন
  2. খুব ভালো লেগেছে আপনার লেখাটি।দুইবার পড়েছি।আন্তরিক ধন্যবাদ আপনাকে মোসলেহ উদ্দিন বাবুল ভাই।

    উত্তরমুছুন
  3. আপনার লেখা গুলো আমাকে খুবই আল্পুত করে! ভালো লেগেছে বাবুল ভাই।

    উত্তরমুছুন
  4. আপনিতো দেখছি দারুণ ভাগ্যবান ও ঐতিহাসিক ভাই।পড়ে ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  5. ইতিহাসের স্বাদ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি ভাইয়া। আল্লাহ্‌ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুক।

    উত্তরমুছুন
  6. আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুক। আমরাও যে স্বাদ পাই এমন রচনা আস্বাদনের। শ্রদ্ধা ও শুভকামনা জানবেন ভাই।

    উত্তরমুছুন

মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷

UA-53225896-1