বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৪

বিজয়ের স্মৃতিকথা >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল






বিজয়ের স্মৃতিকথা >< মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
০১.
১৯৭০ সাল । নভেম্বর। উপকুল জুড়ে বয়ে গেল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় । ৩০ হাজার মানুষ মরে গেলো । আমার বাড়ী ভোলা, সাগর মেখলা উপকুলীয় দ্বীপ । কিন্তু আমি ছিলাম বাণড়ীপাড়া । বানরীপাড়া ইউনিয়ন ইনষ্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র । দুলাভাই পোষ্ট মাষ্টার । তার সাথে । বন্যার তৃতীয় দিনে দুলাভাইর সাথে ভোলা রওনা দিলাম । লঞ্চে ।১২ /১৩ বৎসরের বালক আমি l হাফপেন্ট পড়ি । বরিশাল ছেড়ে ভোলার দিকে যত এগুচ্ছি, বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট । নদীর পাড়ের লোকালয়গুলোতে কোন আস্ত ঘর-বাড়ী বা সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকা কোন গাছ নাই । কালাবদর নদী পেরিয়ে ইলিশা ! কিন্তু এখানে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু ! মানুষের ফুলে ওঠা, ভেসে আসা লাশ । লাশের পরে লাশ । লাশের মিছিলের পাশ কাটিয়ে ফাক ফোকর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে লঞ্চ । অবশেষে ভোলা লঞ্চঘাট । ভোলা থেকে ১২ মাইল দুরে আমাদের বাড়ী, দৌলতখান । বাসে যেতে হয় । আমরা বলি মোটর। এক ঘন্টার পথ । কিন্তু মোটর কোথায় ! রাস্তাইতো নাই ! দুলাভাই দু'টো লম্বা লাঠি যোগাড় করে একটা আমাকে দিলেন । পানির মধ্যে লাঠি দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে পথ খুঁজে নিয়ে চলা । পথে ডোবায় ভেসে থাকা লাশ, ঝড়ে মাথা মুচড়ে যাওয়া গাছের ডগায় আটকে থাকা লাশ, দেখতে দেখতে সন্ধ্যার আধারে পথ চলা । অবশেষে বাড়ী ফেরা ।
কিন্তু বাড়ী কোথায় ! উঠোনের দুই মাথায় দুটো ঘরের একটার চিহ্নই নেই, অপরটার ভিটির উপরে থ্যাবড়ে পড়া চাল, তার নীচে অবশেষে খুঁজে পেতে পাওয়া কিছু তৈজস পত্র নিয়ে বসে আছে আমার মা আর বোন, আর জনার মা, চিরদিনের গরীব মহিলাদের সেই প্রতিনিধি, যারা কিছু নিতে নয়, এমনিতেই ভালবাসতে জানে, বিপদে পাশে থাকতে জানে ।
পরদিন সকালে আনারুল এলো । আমার সারাজীবনের একমাত্র বন্ধু, যার কাছে আমার কোন দোষ-অসমপূর্ণতা ছিলনা, আমি ছিলাম তার একান্তই মনের মতো, পারফেক্ট । আমি ভুল বললেও সেটা সে বিশ্বাসই শুধু করতোনা, সবার কাছে সত্য বলে প্রমাণও করতো । হ্যা, সেই ক্ষমতা তার ছিলো, সে ছিলো প্রকৃতিগতভাবেই ''নেতা'' ।
আনারুলের কাছেই শুনলাম, এমন মহা-প্রলয়ের পরেও আমাদের দুরবস্থা দেখার জন্য সরকারী তরফের কেউ আসেনি । মাঝে মাঝে হেলিকপ্টার উড়ে এসে কিছু রিলিফের বস্তা ফেলে যাচ্ছে, তাতে থাকছে কাঠের চাকার মতো বিস্কুট, চিনি দিয়ে বানানো গুটূলী, আর কোন কোন বস্তায় 'ছাতু' । ছাতু তো আমরা চিনতাম না, মনে করতাম মিষ্টি স্বাদের আটা ।

আনারুল ছাত্রলীগ করতো । আরেক বন্ধু মোহাম্মদ আলী করতো ইসলামী ছাত্র সংঘ । ওদের কাছে জানলাম বন্যার সময় আমাদের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান চীন সফরে ছিলেন । তাকে যখন পাকিসথানে সাইক্লোনের সংবাদটা পৌছানো হয়, তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, 'ইষ্ট অর ওয়েষ্ট ?' 'ইষ্ট' শুনে সংবাদটা তাকে আরো দুদিন পরে দেবার জন্য বলেছিলেন । কারন চীনের সাথে বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূ্র্ণ কাজ তখনো বাকী ।
০২.
১৯৭১ সাল, ৮ই মার্চ । দুপুর ০১-৩০ মিনিট । ভোলা থেকে বরিশাল যাচ্ছি লঞ্চে । লঞ্চ কালা বদর নদীর মাঝে । লঞ্চের ছাদে দুই সাদা চামড়ার বিদেশী ছোট একটা রেডিও নিয়ে বিভিন্ন ষ্টেশন ঘুরছে, আকাশবানীই বেশী । হঠাৎ করে বেজে উঠলো, 'ঢাকা বেতার কেন্দ্র, একদিনের বিরতির পর আমাদের অধিবেশন আবার শুরু হলো । এই অধিবেশন একযোগে সম্প্রচারিত হচ্ছে ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা কেন্দ্র থেকে । এখন প্রচারিত হবে গতকাল রেস কোর্স ময়দানে বাঙ্গালী জাতির অবিসম্বাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণ । ' সমস্ত উৎসুক মানুষের কান খাড়া, মন একাগ্র, বিদেশী দুজনেরও ।
০৩.
২৭ মার্চ । সন্ধেবেলা । বরিশাল পাতারহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে লেঙ্গুটিয়া বাজার । দুলাভাই সেখানে পোষ্টমাষ্টার । আমরা তিন ভাইবোনও সেখানে । দাদা (আমার বড় ভাই শামসুদ্দিন খোকন) ছুটে এসে খবর দিলেন,'একজন চায়নিজ স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার কিছু একটা ঘোষনা দিচ্ছেন, পুরোটা বোঝা যাচ্ছে না ।' দুলাভাই আর আমি ছুটলাম তা শুনতে, গণেশদের ঔষধের ফার্মেসীতে । ''আই মেজ চিয়া, হিয়ার বাই ডিক্লেয়ার, ইন্ডপেন্ডনট অব বাংলাদেশ, বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট লিডার.......' কান্নায় চোখ ভিজে গেল আমার, বুকটা ভারী হয়ে গেছে । বজারের সব লোক ভিড় করে শুনছে বিদেশী লোকটার বক্তব্য, ভাষা দুর্বোধ্য হলেও তার আবেগ স্পর্শ করছে সবার রিদয় । আমি তখন লেঙ্গুটিয়া হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ি।
০৪.
১৬ ডিসেম্বর সকাল নয়টা থেকেই পাক আর্মী সারন্ডারের প্রস্তুতি নিচ্ছল । স্বাধীন বাংলা বেতার এবং আকাশ বাণী কোলকাতা খুলে বসে আছে সারা দেশের গ্রামের মানুষ । আমরা বরিশালে, আমানতগঞ্জে, খালার বাসায় । মাহমুদিয়া মাদ্রাসার একজন তালেবে এলেম আম্মার সাথে দেখা করতে এলো । আল-বদরে ছিলো । ধার্মীক ছেলে, তার মতে এই যুদ্ধ অনিসলামিক । তাই নভেম্বরেই পালিয়েছিল বাহিনী থেকে । পাক আর্মী সারেন্ডার করবে জেনে একটু স্বস্থি পেয়েছে, আর পালিয়ে থাকতে হবে না । মুরব্বীদের দোয়া নিয়ে বিদায় নিলেন । কোথায় যাবে, সেও বলেনি, আমরাও জানতে চাইনি। জানাটা ঠিক হতোনা । তার ভরসা পাওয়াটা কদ্দুর সঠিক ছিল আজও জানতে পারিনি ।
পাঁচটা এক মিনিটে আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষরের পরে এই নর-পশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহন করলো ভারতীয় আর্মী । অবশ্য তার অনেক আগেই পাকিস্তানে থাকা বাঙ্গালীদেরকে কনসেনটেশন ক্যাম্পে জিম্মি করে ফেলেছে পাকিস্তান । আমাদের প্রতিশোধ নেয়ার পথ খোলা রইলনা ।
অবশ্য বর্তমানের মতো অবস্হা যদি থাকতো, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব যদি থাকতো অন্য কোন দল, তাহলে পরিস্থিতি অবশ্যই অন্যরকম হতো । মন ভরে পাক আর্মী আর বিহারী, দালাল হত্যা করে মনের ঝাল মিটাতে পারতাম আমরা । পাকিস্তানে আটক তিন হাজার বাঙ্গালীকে ওরা কোরবানী দিতো, তাতে আমাদের কি, ওদের অনেকে তো দেশে ফিরেও পাক-দালালীই করেছে !
কিন্তু ঐ সময়ের আমরা একফোটা বাঙ্গালী রক্তও ঝড়াতে চাইনি । দালাল আইনে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদ বোধ করেছেন ফ. কা. চৌধুরী । সবুর খানকে গোপনে অর্থ সাহায্য করেছেন বঙ্গবন্ধু । সেই বাঙ্গালী কি আছে ? এখন আছে বাংলাদেশীরা !










৬টি মন্তব্য:

  1. বিজয়ের স্মৃতিকথা পড়ে খুব ভালো লাগলো বাবুল ভাই। অভিবাদন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে...

    উত্তরমুছুন
  2. বাংলাদেশ ইতিহাস ভিত্তিক স্মৃতিকথা লেখার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।এ প্রজন্মের জন্য খুবই উপকারী এই রচনা।

    উত্তরমুছুন
  3. বাহ্‌ দারুণ উদ্যোগ বাবুল ভাই। আন্তরিক ধন্যবাদ আপনাকে।

    উত্তরমুছুন
  4. আমাদের জন্য খুবই উপযোগী এই বিজয়ের স্মৃতিকথা।অভিবাদন আপনাকে।

    উত্তরমুছুন
  5. বিজয়ের স্মৃতিকথার জন্য অভিনন্দন ভাইয়া।

    উত্তরমুছুন
  6. আপনার স্মৃতিকথা পড়ে ,মুক্তিযোদ্ধা আমার আব্বুর কথা মনে পড়ে গেলো বাবুল ভাই। তাঁর কাছ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক বীরগাঁথা শুনেছি। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

    উত্তরমুছুন

মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷

UA-53225896-1