নূরুজ্জামান মনি
------------------------------------------------------------------------------------------------------------
১.
প্রথমে আমার ভালবাসা নিও ৷ নবীন ফুলের
মতো নিশ্চয়ই আজো তুমি আছো সতেজ-সবুজ,
তোমার শখের ড্রেসিং টেবিল – তুমি আজো রোজ
তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে কি গো দেখো তরঙ্গ চুলের?
কার অভিশাপে জানি আমি আজ দূর পরবাসে
একাকী প্রহর যাপি, দেহের ভেতরে নেই মন –
সে আছে তোমার কাছে ছায়ার মতোন সারাক্ষণ;
ভ্রমরের মতো ডুবে রয় স্নিগ্ধ দেহের সুবাসে ৷
সেই সোনামুখী দিনগুলো মনে এলে মন ভরে
ওঠে ঘ্রাণময় ফুলে; কে নিল হরণ করে সেই
ফুলের পরাগ ৷ আমার অন্তরে আর যেন নেই
কোনো উৎসব; বিরহী বিহঙ্গ মাথা কুটে মরে ৷
তোমাকে গড়েছি আমি সখি, মনের মাধুরী দিয়ে,
চিরদিন থেকো তুমি অপরূপা, অনন্ত যৌবনা –
তোমাতে বসন্ত হোক কুসুমের সুরভিতে বোনা,
পৃথিবী সুন্দর হোক তোমার দেহের আলো নিয়ে ৷
তুমি ভাল থেকো, সুখে থেকো – অনন্ত প্রার্থনা এই –
জীবনের প্রান্তে ফের আমাদের সাক্ষাত হবেই ৷
২.
যদি আর কোনোদিন সেই চন্দ্রিল বালক হয়ে
তোমার হৃদয়ে ঢেউ জাগাতে না পারি, যদি আর
কোনো শুভক্ষণ মেলে না গো হায় তোমাকে পাবার –
তবে থাকি যেন তোমার ভুবনে আমি সুখ-স্মৃতি হয়ে ৷
একদিন চেয়ে দেখো দূরের পাহাড়ে কত মেঘ
ঘুমিয়ে রয়েছে, জানালার কাছে ফুটে রবে ফুল –
পাখিরাও গেয়ে যাবে গান সেই নিকুঞ্জে নির্ভুল;
উদাস বনান্তে সারাদিন রবে বাতাসের বেগ ৷
মনে রেখো এই পৃথিবীতে হারায় না কিছু, কোনো
স্মৃতি সূর্যাস্তের মতো হয় না বিলীন; আমিও তো
রয়ে যাব তোমার ভুবনে অপূর্ণ ইচ্ছের মতো –
সেদিন আমার গান নিজ মনে কান পেতে শোনো ৷
এক ফোঁটা অশ্রু যদি কোনোদিন তোমার চিবুক
ছুঁয়ে এসে ঠোঁটের সীমান্তে নামে – যদি কোনোদিন
মন খারাপের মেঘ তোমাকে বানায় লেশহীন,
যদি কোনো নতুন তরঙ্গ এসে ভরে দেয় বুক,
সেদিন আমার কথা মনে রেখে ভুলে যেয়ো সব,
তোমার হৃদয়ে যেনো বেঁচে থাকে প্রেমের গৌরব ৷
৩.
বৃক্ষের সকল ডালপালা যেমন আলোর দিকে
চেয়ে থাকে, তেমনি আমার মন কাঙালের মতো
তোমার রূপের দিকে চেয়ে আছে; নিজেই বিব্রত
আমি দেখে হৃদয়ের এই কাঙাল বাসনাটিকে ৷
কী রূপ তোমার! কোন সে নিপুণ রূপের ভাস্কর
গড়েছে তোমায়; যেনো গল্পে শোনা রাজদুহিতার
দেহের কিরণ তোমাতে এসেছে নেমে; বার বার
দেখলেও পিপাসা মেটে না ৷ এই মুখ নিরন্তর
আমাকে আলোক দেয় – প্রাণে ঢালে রৌদ্রের কিরণ ৷
এই গ্রীবা – জল ছলকে ওঠা হাসি, পিঠময় চুল;
পাখির ডানার মতো জোড়া ভুরু, গালে পড়া টোল,
ডালে বসা যুগল ঘুঘুর মতো একজোড়া স্তন ৷
তোমার দেহের ঘাটে ছিপ ফেলে বসে আছি, স্থির
ফাৎনার দিকে চোখ – কখন যে নড়ে ওঠে, হায়
কখন ঠোকর দেবে – জানাবে সম্মতি ৷ সে আশায়
আমার সমস্ত মন হয়ে আছে চঞ্চল-অধীর ৷
মেঘবতী হে আমার ওগো অনন্ত তৃষ্ণার জল
তোমার কিরণ-সুধা আমাতে ঝরাও অবিরল ৷
৪.
ঘর বাঁধা মানেই তো প্রেমের মরণ, সে কথা তো
জানো তুমি; বড় প্রেম কখনোই ছুটে যায় না যে
মিলনের পথে – কালি-ঝুলিমাখা সংসারের কাজে;
সে প্রেমের ঠাঁই ইতিহাসের পাতায় দেখি না তো ৷
অনন্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রাণ থাকে দূরে দূরে;
জানো তো যে ধন মিলে যায় হাতে হাতে – সব
প্রয়োজন নিমেষে ফুরোয়; পূত প্রেমের গৌরব
ধুলোয় লুটোয়; স্বপ্নের মহল যায় ভেঙে চুরে ৷
আজীবন হয়ে থাকো তাই চির যাযাবর পাখি,
ডালে ডালে উড়ে উড়ে করে যাও দয়িতের খোঁজ –
ছিঁড়ে যাবে মালা? দলে যাবে ফুল? ওতোটা অবুঝ
হয়ো নাকো তুমি ৷ কণ্ঠে রক্ত তুলে তোমায় ডাকি,
যেমন বিরহী কেকা ডাকে দূর বনে বসন্তের কালে,
যেমন আষাঢ় এলেই উন্মনা হয় ময়ূরীর মন –
তেমনি তোমাকে খুঁজি, হায়, ডেকে ফিরি অনুক্ষণ;
নীড় নয় নাই হলো আমদের বাঁধা কোনো কালে ৷
সব পাখি বাঁধে না যে ঘর, ক্ষতি কিছু নেই তাতে
ঘরহীন তুমি আমি ভেসে যাব প্রেমের মৌতাতে ৷
৫.
আমার মনেরে আমি বোঝাতে পারি না, হায় মন
সে বড় অবুঝ; যতই প্রবোধ দিতে চাই, যত বলি
আকাশের ওপারে আকাশ, তারাদের গলাগলি –
পাখিরাও কণ্ঠ মেলায়, শোনায় দাদরা-ইমন;
তুমি কেন শুধু অসম্ভব এক স্বপ্ন বুকে রাখো?
তবু মন মানে না যে, মানে না সে শাসন-বারণ;
বুকে বড় তৃষ্ণা, বড়ই পিপাসা – জানি নাতো কারণ,
স্বপ্নের ভেতর যেন পার হই অতি দীর্ঘ সাঁকো ৷
সাঁকোর ওপারে পবো তার দেখা, তাহার সাক্ষাত;
কত অভিমান জমে আছে বুকে, কত অভিযোগ –
কত প্রেম, কত বিরহের স্মৃতি – কত অনুযোগ;
মুখোমুখী বসে বলে যেতে চাই কত শত রাত ৷
আমার ভেতরে যেন আরেক মানুষ – সে পৃথক
দেহ নিয়ে করে বসবাস; মানে না প্রবোধ সে যে,
যাকে চায়, তাকে কেড়ে নিতে চায় যেন বীর সেজে –
হতে চায় হরবোলা পথহারা পথের কথক ৷
মনের অলিন্দে পড়ে আছে তার দেহের সুবাস;
দেহ নয়, তবু পাই তার স্নিগ্ধ গ্রীবার উদ্ভাস ৷

দারুন কিছু কবিতা । ভালো লেগেছে ।
উত্তরমুছুনস্বাগতম কবি। আমাদের সাথেই হোক আপনার চমৎকার নান্দনিক লেখনির পথচলা...
উত্তরমুছুনদীর্ঘ দিন পর আপনার নান্দনিক কবিতা গুলো উপভোগ করেছি মনি ভাই ! কেমন আছেন ?
উত্তরমুছুনঅভিনন্দন কবি ।কবিতার পুরো প্রাণ পেলাম। আরো পড়তে চাই এমন হৃদয় কাড়া কবিতা ।
উত্তরমুছুনকবি সিলেটে ২০০৪ সালে আপনাকে কিছুটা সময় পেয়েছিলাম।আন্তরিকতা এখনো ভুলিনি।এখানে দেখে ভালো লাগলো। সেই সাথে অসাধারণ একগুচ্ছ অষ্টাদশী ! অভিনন্দন আপনাকে...ভালো থাকুন প্রতিনিয়তই।
উত্তরমুছুন"একগুচ্ছ অষ্টাদশী" পড়ে মনে হলো কবি যেন তাঁর জীবনের সকল আবেগ-ভালোবাসা অকপটে মনে মাধুরীতে ঢেলে দিয়েছেন। অশেষ ধন্যবাদ কবি।
উত্তরমুছুন"একগুচ্ছ অষ্টাদশী" পড়ে মনে হলো কবি যেন তাঁর জীবনের সকল আবেগ-ভালোবাসা অকপটে মনে মাধুরীতে ঢেলে দিয়েছেন। অশেষ ধন্যবাদ কবি।
উত্তরমুছুন