মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৪

ওবায়দুল গনি চন্দন : আমার প্রিয় মানুষ,প্রিয় স্মৃতি




মোসলেহ উদ্দিন বাবুল
========================================================================
আমি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের মারিশ্যায় কর্মরত । উপজাতিয়দের সাথে যুদ্ধরত বাংলাদেশ । আমিও এই প্রক্রিয়ার অংশ । আমি তো লেখালেখিতে চিরদিনই অনিয়মিত এবং খেয়ালী । পার্বত্য চট্টগ্রামে যাবার পর থেকেই বিচ্ছিন্ন, স্বদেশ থেকে । যেখানেই থাকি, সেবা প্রকাশনীর মাসিক 'রহস্য পত্রিকা' পড়ি ই । তখন উপজাতিয় ভাষা ও সংস্কৃতির উপর একটা কোর্সে অংশগ্রহন করছি রাঙ্গামাটি সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউটে । বনরূপা বাজারের পেপার ষ্টলে 'রহস্য পত্রিকা' কিনতে গিয়ে 'কিশোর তারকালোক' ও কিনে ফেললাম এক কপি । খুব ভালো লেগে গেলো ।

কোর্স শেষে মারিশ্যায় ফিরে আসার পরে হঠাৎ করেই মনে হলো আমার তো কিছু লেখা রেডিই আছে, পাঠিয়েই দেই না কেন ! বয়ে বেড়ানোর ঝামেলা থেকে তো মূক্ত হবো ! মূক্তিযুদ্ধের উপর লেখা 'যুদ্ধ চতুর্দিকে' এবং দক্ষিন বাংলার প্রাকৃতিক আবহে একটা সাইন্স ফিকশন 'গ্রহের নাম কারকু' । যথাক্রমে 'রহস্য পত্রিকা' এবং 'কিশোর তারকালোক' এ পাঠিয়ে দিলাম । তারপর ভুলে গেলাম ।

দু'টো চিঠি পেলাম একসাথে । সৌজন্য কপিসহ রহস্য পত্রিকা এবং কিশোর তারকালোক থেকে । রহস্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ জানতে চেয়েছেন, হাসেম খানের আকা ছবি ও ইলাষ্ট্রশনসহ প্রকাশিত উপন্যাসটির সন্মানী আমি কিভাবে পেতে চাই, মনি অর্ডারের মাধ্যমে, না ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে ! কিশোর তারকালোক থেকে চিঠিটি পাঠিয়েছেন একজন সহ-সম্পাদক, তিনি লেখার জন্য অভিন্দন জানিয়ে নিয়মিত লেখক হিসাবে আমাকে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার কর্তৃপক্ষীয় প্রস্তাব দিয়ে জানতে চেয়েছেন, লেখার সন্মানী আমি কি পদ্বতিতে collection করতে চাই ।

এই সহ-সম্পাদকটিই ছিলেন ওবায়দুল গণি চন্দন । কিশোর তারকালোকে ওবায়দুল গণি চন্দনের হাত দিয়ে আমার বেশ ক'টি কিশোর উপন্যাস এবং অনুবাদ গল্প নিয়মিত গেছে । কিন্তু মুখোমুখী হলাম অনেক পরে, ১৯৯৮ সালে ।

মাসুম রহমান আকাশ তার যৌথ ছড়াগ্রন্থ 'রাজাকার' প্রকাশ করবেন সিলেটে তার নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা 'শেকড়ের সন্ধানে' থেকে । আট জন ছড়াকার, প্রত্যেকের ছড়া থাকবে নয়টি করে । আকাশ আমাকে তার পরিকল্পনা জানালো, সে এমন একজন ছড়াকার এড করতে চাচ্ছে, যে তরুন, একস্ট্রা অর্ডিনারী পার্সোনালিটি, ছড়াও হবে অনন্য-সাধারন , ঢাকার হতে হবে । এতো শর্ত ! ভাবতে বসলাম ।

আলাদিনের চেরাগ পেয়ে

পাশের বাড়ীর নাজির,

মেঝেতে যেই মারলো ঘষা

দত্যি এসে হাজির ।

দত্যি বলে-হুকুম করুন

করতে কি কি পারি ?

বসুন্ধরায় প্লট কিংবা

হোন্ডা সিভিক গাড়ী ?

বললো নাজির ওসব কিছুর

নাই প্রয়োজন নাই,

স্বাধীনতার বিরোধীদের

লিষ্টি শুধু চাই ।

দত্যি বলে 'মাফ করবেন

বুক করে ধড়ফড়,

ওরা এখন আমার চেয়েও

ভয়াল ভয়ংকর ।'

ইউরেকা !

পেয়ে গেছি । ওবায়দুল গনি চন্দন । ছড়া-ফিচার লিখেছে অনেক । এই ছড়াটাও তার, কিন্তু ছাঁপা হয়নি পারিপার্শ্বিকতার কারনে । এর চেয়ে যোগ্য আর কাকে পাবো ! আকাশকে বললাম । নির্বাচিত হয়ে গেলো ৮ জন ছড়াকার । এবং আমার পরিকল্পনা মতোই 'রাজাকার' ছড়াগ্রন্থর প্রথম নয়টি ছড়াই ছিলো আমার পছন্দের এই 'আগুন-ছড়াকার' এর । এই যৌথ-গ্রন্থের জন্য তার অন্যতম ছড়া ছিলো এই দু'টিও ....

০১.

বই

বইটা ছিল চার ফর্মার,

লেখক টিভির পারফরমার ।

লেখাতো নয় ছাই !

বাক্য গঠন শব্দ প্রয়োগ

মাথা মুন্ডু নাই ।

হায়রে আমার দেশ !

তবু নাকি সেই বইটার

ফার্ষ্ট এডিসন শেষ ।

বলি, বেশ .. বেশ ... বেশ ....

০২.

পার্টস অফ স্পিচ


সবাই জানি কোনো কিছুর
নামকে বলে নাউন,
যেমন ঢাকা টাউন ।


প্রো-নাউনের হয় ব্যবহার
একটা শুধু শর্তে ,
নাউনের পরিবর্তে ।


যখন তুমি এটা সেটা করতে
করতে কিছু পারবে,
পড়বে সেটা ভার্বে ।


এডজেকটিভ এডভার্ব আর
প্রি-পজিশন,
বলো দেখি জলদি তাদের
কী পজিশন?


কথা শোনো আমার
বইটা খোলো গ্রামার


আরো পাবে কনজাংশন
ইন্টারজ্যাকশন,
পার্টস অফ স্পিচ ওদের নিয়েই
করে যে অ্যাকশন।

আমি এই প্রথমবারের মতো গ্রীন রোডের তারকালোক কমপ্লেক্সে গেলাম, সাথে আমার ভাগ্নে আলমগীর (বর্তমানে ব্যস্ত মিউজিশিয়ান), সম্পাদক-প্রকাশক মাসুম রহমান আকাশ এবং ছড়াকার কমল আনসারী (অনুপ্রাস বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক) । সম্পাদক সাহেবের সাথে দেখা করলাম । এই পত্রিকার তালিকাভূক্ত নিয়মিত লেখক আমি, লেখা যাচ্ছে রেগুলার, অথচ সম্পাদক সাহেব আমার চেহারাই দেখেন নি ! মজার রস রসিকতা হলো । একাউন্টস সেকশনে জমে থাকা সন্মানীর টাকার হিসাবও হলো । চন্দনের সাথে তো কথা হলোই । অদেখা থাকতে যতোটা, দেখা হবার পরে আগের চেয়ে বেশী পছন্দ হয়ে গেলো আমাদের পরস্পরকে ।

এরপরে চন্দনের প্রিন্ট থেকে ইলেক্ট্রনিক এবং ইলেক্ট্রনিক থেকে প্রিন্ট মিডিয়ায় বিরতিহীন ব্যস্ততার ইতিহাস, আশাবাদ, বিরক্তি, সংগ্রাম, যখনি ইচ্ছা হতো জানাতো সে আমাকে । আমি তার কাছে ছিলাম ডায়েরীর পাতার মতো , মানুষ যেমন ইচ্ছে হলে লিখে রাখে রোজ নামচা প্রত্যাশা এবং প্রতিক্রিয়াহীন ।

ওবায়দুল গনি চন্দন দৈনিক মানবকন্ঠের ফিচার এডিটর ছিলেন। এর আগে তিনি সাড়ে ছয় বছর বাংলাভিশন ও বৈশাখী টিভিতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন। ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতে ছিলেন ডেপুটি নিউজ এডিটর।

চন্দন ৩০টির মতো টিভি নাটক লিখেছেন। চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকের গানসহ বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল লিখতেন নিয়মিত।

 চন্দন ‘অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন দুইবার। ‘থাকছি ঢাকায় সবাই ফাইন, চারশ বছর চারশ লাইন’-ছড়াগ্রন্থের জন্য তিনি এ পুরস্কার পেয়েছেন। এর আগে ২০০০ সালে সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘কান নিয়েছে চিলে’ ছড়াগ্রন্থের জন্য অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।

তারপর ক্রমশঃ ...

ওবায়দুল গনি চন্দনের প্রথমবার হাসপাতালে যাবার সংবাদটা পেয়েছি ফেসবুকে । এবার আমিই অগ্রণী হয়েছিলাম যোগাযোগে । পরের বার সংবাদটা দেখলাম টিভির স্ক্রলে । কি বলবো ! বন্ধু দিবসে তার আপলোড দেওয়া লেখাটা কেউ কি আবার শোনাবে আমাকে !!!

কারন, ওটাই ওবায়দুল গনি চন্দনের উপর সকল লেখার উপসংহার ।

৭টি মন্তব্য:

  1. অনেক তথ্যপূর্ণ ! চমৎকার উপসংহার, বক্তব্য এবং স্মৃতির বিস্তৃতি ভাইয়া। অভিনন্দন আপনাকে।

    উত্তরমুছুন
  2. অনেক অজানা কে জানা হলো। ধন্যবাদ বাবুল ভাই।

    উত্তরমুছুন
  3. আন্তরিক ধন্যবাদ বাবুল ভাই স্মৃতিকথা আমাদের শেয়ার করার জন্য।

    উত্তরমুছুন
  4. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  5. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন

মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷

UA-53225896-1